বাংলাদেশিদের ভিসা দিতে কড়াকড়ি আরোপের সুপারিশ করেছে ইউরোপীয় কমিশন। আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভায় এ সুপারিশ সিদ্ধান্তে পরিণত হলে বাংলাদেশিদের ইউরোপের দেশগুলোতে যাওয়া কঠিন হতে পারে। ফলে ইউরোপের যে কোন দেশে ভিসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের সমস্যার মুখে পড়তে হবে।

ইউরোপীয় কমিশনের এ অবস্থানের কারণ, বাংলাদেশ ইউরোপে অবৈধ হয়ে পড়া প্রবাসীদের ফেরাতে দ্রুতগতির পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এটা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোতে অসন্তোষ তৈরি করেছে। তারা এ বিষয়ে কমিশনের কাছে অভিযোগ করেছে। এ প্রেক্ষাপটে অবৈধদের ফেরানোর কার্যক্রমে গতি আনতে ইউরোপীয় কমিশন গত ১৫ জুলাই সাময়িকভাবে বাংলাদেশিদের ভিসায় কড়াকড়ির সুপারিশ করে।

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবৈধদের ফেরাতে সই হওয়া মানসম্মত কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী অগ্রগতি না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এ পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। অবৈধ হয়ে পড়া লোকজনকে ফেরাতে ইইউ বাংলাদেশের সঙ্গে এসওপি সই করে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে।

ইউরোপীয় কমিশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের জন্য কড়াকড়ির সুপারিশ করা হয়েছে চারটি ক্ষেত্রে—১. পর্যটকসহ বেশ কিছু শ্রেণিতে শেনজেন ভিসার (ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর অভিন্ন ভিসা) আবেদনের জন্য বাংলাদেশের নাগরিকদের অতিরিক্ত কিছু নথিপত্র জমা নেওয়া হতো না। সেই ছাড় আর পাওয়া যাবে না। অবশ্য নথিপত্রগুলো কী কী তা পরিষ্কার করেনি ইউরোপীয় কমিশন।

২. বাংলাদেশের নাগরিকেরা সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে ভিসা পাওয়ার সুবিধা পেতেন। এ সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে।

৩. বাংলাদেশিরা আর দীর্ঘমেয়াদি মাল্টিপল (একাধিকবার যাতায়াতের) ভিসা পাবেন না। ৪. বাংলাদেশের কূটনীতিক পাসপোর্টধারীদের ভিসা ফি না রাখার যে ঐচ্ছিক সুবিধা ছিল, সেটিও বাদ যাবে।

বাংলাদেশের পাশাপাশি এ দফায় ইরাক ও গাম্বিয়ার জন্য ইউরোপে ভিসা কড়াকড়ির সুপারিশ করা হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশন বাংলাদেশিদের ভিসার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপের বিষয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ও ইউরোপীয় কাউন্সিলের কাছে ১০ পৃষ্ঠার সুপারিশ প্রতিবেদন পেশ করেছে। ওই সুপারিশে উল্লেখ করা হয়, অবৈধদের যে তালিকা বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছিল, তা যাচাই করে ফেরত পাঠানো এবং যাঁদের পরিচয় নিশ্চিত হবে, তাঁদের জন্য ‘ট্রাভেল ডকুমেন্ট’ ইস্যুর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি রাখতে ব্যর্থ হচ্ছিল। ২০২০ সালের নভেম্বরে অনলাইন পদ্ধতি বা রিটার্নি কেইস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আরসিএমএস) চালুর পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

ইইউর পক্ষ থেকে এ অসন্তোষের বিষয়টি গত জুন মাসে অনুষ্ঠিত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকেও বাংলাদেশকে বলা হয়। ইউরোপীয় কমিশন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের কাছে গত ১৩ জুলাই পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার মানুষের তালিকা অনলাইন প্রক্রিয়ায় পাঠানো হয়। এর মধ্যে ১৯৫ জন বাংলাদেশি বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁদের দেশে ফিরিয়ে নিতে ট্রাভেল ডকুমেন্টও বাংলাদেশের দূতাবাস ইস্যু করেছে। আরও ১০০ জনের পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া বাড়তি ২০০ জনের পরিচয় নিশ্চিতের বিষয়টি ইন্টারপোলের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে।

এদিকে অবৈধ ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে গত ১০ জুন বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল ছয় দিনের জন্য মাল্টা সফর করে। এ সময় তারা ১৬০ জনের সাক্ষাৎকার নেয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন পর্যন্ত যে দেড় হাজার লোকের তালিকা দিয়েছে, তার অর্ধেক রয়েছে জার্মানিতে। বাকিরা মাল্টা, গ্রিস ও ইতালিতে রয়েছেন।

গ্রিসে বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, দেশটিতে এখন প্রায় ৩০ হাজারের মতো বাংলাদেশি কৃষি খামার, তৈরি পোশাক কারখানা, রেস্তোরাঁ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১২ হাজারের সে দেশে বৈধতা আছে। আর মাল্টায় প্রায় হাজার দুয়েক বাংলাদেশি রয়েছেন।

বাংলাদেশিরা স্থল ও নৌপথে নানা রুটে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করেন। করোনা সংক্রমণ শুরুর পর অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার পথে বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, লিবিয়া ও তিউনিসিয়া থেকে বাংলাদেশিদের উদ্ধার করার ঘটনা ঘটেছে।

এখনো ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীবাহী নৌকাডুবি বা আটকের ঘটনা ঘটলে সেখানে বেশিরভাগই থাকছেন বাংলাদেশি এবং আফ্রিকানরা।