দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনীতির মাঠ। রাজপথে সরব বিরোধীরা, কূটনীতিকেদের দৌড়ঝাঁপও দিচ্ছে সেই বার্তাই। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলকে ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত রাখাসহ অন্তত ৫০টি নির্দেশনা পেয়েছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতারা।
নির্বাচনের মাস পাঁচেক আগে সারাদেশের বিভিন্ন শাখার নেতাদের ঢাকায় ডেকে এনে এই নির্দেশনা দেন আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ রোববার (৬ই আগস্ট) আয়োজিত এ সভায় যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান ও তার সহযোগীরা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া আওয়ামী লীগের প্রতিটি সাংগঠনিক জেলা, উপজেলা, পৌরসভা কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে বিশেষ বর্ধিত সভা করেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় তৃণমূলের নেতাদের বিভিন্ন নির্দেশনা দেন তিনি।
নেতারা জানান, নির্বাচনে দল যাকেই প্রার্থী করবে তার পক্ষে কাজ করতে বলেছেন দলীয় প্রধান। মানুষের কাছে সরকারের উন্নয়নের চিত্রও তুলে ধরতে বলেছেন।
বর্ধিত সভায় প্রতিটি বিভাগের নেতাদের কাছ থেকে শেখ হাসিনা স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা ও দলীয় নানা বিষয় শোনেন বলে জানান তৃণমূলের নেতারা। সরকারের গত ১৫ বছরের উন্নয়নের চিত্র মানুষের কাছে তুলে ধরতে নির্দেশ দেন দলীয় সভানেত্রী।
সংসদ নির্বাচনের আগে বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা তৃণমূল নেতারা। আগামী জাতীয় নির্বাচনে দল যাকেই মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই কাজ করারও নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা।
দলীয় সভানেত্রীর নির্দেশনা ও কেন্দ্রের পরামর্শ নিয়ে আবারো নৌকাকে বিজয়ী করার প্রত্যয় তৃণমূলের নেতারা। সেইসাথে বিরোধী পক্ষের সকল ষড়যন্ত্র রুখতে মাঠে থাকার ঘোষণা দেন তারা।
সরকারপ্রধান বলেন, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত টানা ১৪ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার কারণে দেশের ধারাবাহিক উন্নয়ন হয়েছে। আজকের বাংলাদেশ বদলে যাওয়া বাংলাদেশ, আজকের বাংলাদেশ বিশ্বে সম্মানের বাংলাদেশ। আমরা যখন স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করেছি তখন জাতিসংঘ আমাদের উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করার ফলে আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের যাত্রা শুরু হবে ২০২৬ সাল থেকে।
জনগণকে নৌকায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কি চায় উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা নিয়ে তারা এগিয়ে চলুক? বাংলাদেশের জনগণকে প্রশ্ন করবেন, কারণ জনগণ হচ্ছে ভোটের মালিক। তারা যদি চায় বাংলাদেশ উন্নয়নশীল মর্যাদা নিয়ে এগিয়ে যাবে, প্রতিষ্ঠিত হবে। তাহলে নৌকা মার্কা আর আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে হবে। আওয়ামী লীগ ভোট পেলেই এটা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। যা বাংলাদেশে ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামে পরিচিত। রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেদিন বিকেলে জরুরি অবস্থা জারির পর বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়।
আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় ওয়ান-ইলেভেন প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির দুর্নীতি ও দুঃশাসনের কারণেই ওয়ান ইলেভেন হয়েছিল। খালেদা জিয়া ভোটচোর হিসেবে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল।
২০০১ সালের নির্বাচনে ষড়যন্ত্রের কারণে আওয়ামী লীগ হেরেছে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, গ্যাস বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায় এবং দেশি-বিদেশি নানা চক্রান্তের কারণে ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসতে পারেনি আওয়ামী লীগ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দারিদ্র্যের হার ৪১ ভাগ ছিল, সেখান থেকে আমরা কমিয়ে ১৮-তে নিয়ে এসেছি। একটি পত্রিকায় এক অর্থনীতিবিদের আর্টিকেল পড়লাম। তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার কমেছে নাকি শুধু দুটি ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানের কারণে। সে ভদ্রলোকের নাম আমি বলব না, আমি জিজ্ঞাসা করতে চাই, যদি এনজিওদের ক্ষুদ্র ঋণে দারিদ্র্য বিমোচন হয়ে থাকে তাহলে বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন আগে হলো না কেন?
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনা করেই দরিদ্রতার হার ১৮ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। আগে কেন ১৮ শতাংশে আসেনি? আমি অর্থনীতিবিদদের কাছে জিজ্ঞাসা করব, তারা কোন অঙ্কে এসব হিসাব করেন? ২০০৯-এর আগে কি এনজিওর ঋণ দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে? হয়নি।
তৃণমূলের নেতাদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘মনোনয়ন যাকেই দিই। আমি কিন্তু ঘরে বসে থাকি না, সারাদিন কাজ করি, সংগঠনেরও কাজও করি। কোথায় কার কী অবস্থা সেটা কিন্তু ছয় মাস পর পর জরিপ করি। আমাদের এমপিদের কী অবস্থা, অন্য জনপ্রতিনিধিদের কী অবস্থা তার একটা হিসাব নেওয়ার চেষ্টা করি। জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর ওপর নির্ভর করছে আমাদের ক্ষমতায় যাওয়া বা না যাওয়া। সে কথাটা মাথায় রেখে, আমাদের উপরে ভরসা রাখতে হবে। আমরা যখন মনোনয়ন দেব, অবশ্যই আমাদের একটা হিসাব থাকবে যে কাকে দিলে আমরা আসনটা ফিরে পাব।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেক এসএমএস দিলে, গিবত গাইলেই আমি তাদের কথা শুনব, এমন না। এটা আমি স্পষ্ট বলে দিচ্ছি। কারণ আমার নিজের হিসাবনিকাশ আছে। ৪২ বছর আপনাদের সঙ্গে আছি। ১৯৮১ সালে সভাপতি নির্বাচিত করেছেন। এরপর কিন্তু আমি প্রতিটি এলাকায় ঘুরে ঘুরে দেখেছি। ফলে আমার কিন্তু ধারণা আছে। কার অবস্থা কী সেটা বুঝেই কিন্তু আমরা মনোনয়ন দিই।’
দলীয় নেতারা জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সম্পর্কে কড়া বার্তা দিয়েছেন। আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন। দলে ভিন্নমতাবলম্বীদের কোনো জায়গা থাকবে না বলে স্পষ্ট সতর্কবার্তা জানিয়েছেন।
দলের নেতারা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি, বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি দলের বক্তব্য এবং বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নেতাদের মনোবল বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী ওই বৈঠকে আহ্বান জানান।