একটানা প্রবল বর্ষণ আর জোয়ারের পানিতে ডুবে আছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অনেক এলাকা। সড়ক অলিগলি বাড়িঘর দোকান পানির নিচে। আজ (রোববার) সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘন্টায় ২১৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সেই সাথে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উঁচু জোয়ারের পানি ঢুকে জলাবদ্ধ নগরী এখন চট্টগ্রাম। টানা বর্ষণে পাহাড় ধসের ঝুঁকি থাকায় ২৫০টি পরিবারকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
বৃষ্টির তীব্রতা মাঝেমধ্যে কমায় কিছু এলাকার পানি নেমে গেলেও কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে রাস্তাঘাট ও বাড়ির আনাচকানাচ। সব মিলিয়ে গতকালও অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে নগরবাসীকে। এ পরিস্থিতি আরও দু’দিন চলতে পারে বলে আবহাওয়া অফিস থেকে সতর্ক করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ভারী বর্ষণ শুরুর পর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দেয় উচ্চ জোয়ারের পানি। তলিয়ে যায় নগরীর অধিকাংশ নিচু এলাকা। শুক্রবার জলমগ্ন ছিল নগরবাসী। সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর বাসভবনও কোমরপানিতে ডুবে যায়। ঘরবন্দি হয়ে পড়েন নগরপিতা। পানি ঢুকে পড়ে বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও মসজিদেও। গতকাল দ্বিতীয় দিনেও পানি না সরে যাওয়ায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ঘরের আসবাবপত্র, দোকান ও গুদামের পণ্য। সড়কগুলো তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচলও। অনেক বাসাবাড়িতে জ্বলছে না চুলা।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গতকাল সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টায় ৬২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি বর্ষণ হয়েছে নগরীতে। সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রামে আরও দু’দিন ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। সেই সঙ্গে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত থেমে থেমে বর্ষণ হতে পারে। এ কারণে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখতে বলা হয়েছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ উজ্জ্বল কান্তি পাল জানান, নিম্নচাপের কারণে চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। যেসব এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে বা হবে, সেসব এলাকায় পাহাড় ধসের আশঙ্কা আছে।
নগরীর কাপাসগোলা ও চকবাজার এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পানিতে থইথই করছিল পাশাপাশি অবস্থিত এই দুটি এলাকা। বহদ্দারহাট-বাদুরতলা-চকবাজার সড়কের কাপাসগোলা এলাকাটি এক প্রকার ডোবায় পরিণত হয়। সড়কটির কোথাও কোথাও হাঁটু থেকে কোমরপানি জমে যায়। এ সময় যান চলাচল ব্যাহত হয়। ইঞ্জিনে পানি ঢুকে যাওয়ায় অনেক অটোরিকশা বিকল হয়ে পড়ে। লোকজনকে কয়েক গুণ বাড়তি ভাড়ায় প্যাডেলচালিত রিকশায় চলাচল করতে দেখা যায়। কাপাসগোলা মোড়ে রিকশার চাকা পর্যন্ত পানিতে ডুবে যায়। নগরীর মুরাদপুরের অবস্থা ছিল আরও ভয়াবহ। জলাবদ্ধতা এড়াতে অনেক যানবাহন বহদ্দারহাট মোড় থেকে ফ্লাইওভার দিয়ে লালখানবাজার পর্যন্ত চলাচল করে। ফ্লাইওভারেও ওঠানামার পথে যানজট তৈরি হয়।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা আবুল হাশেম জানান, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে জোর চেষ্টা চলছে। আটকে যাওয়া পানি চলাচল নির্বিঘ্ন করতে খাল ও নালাগুলোর যেসব স্থানে ময়লা-আবর্জনা জমে আছে, সেগুলো অপসারণ করা হচ্ছে। এতে জলাবদ্ধতা আগের মতো স্থায়ী হচ্ছে না।
টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে বহদ্দারহাটে সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর বাড়ির উঠান, সামনের গলি ও সড়কে। পানি এড়াতে গতকাল দুপুরের দিকে সিটি মেয়রকে রিকশায় করে বাসায় ফিরতে দেখা যায়। সে সময়ও হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। তাই রিকশায় বসা অবস্থাতেই মেয়রের মাথার ওপর ছাতা ধরে বৃষ্টি থেকে রক্ষার চেষ্টা করেন তাঁর বাড়িতে কর্মরত নিরাপত্তাকর্মী।
এদিকে রিকশায় করে মেয়রের বাড়ি ফেরার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে লোকজন জলাবদ্ধতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। ভিডিওতে দেখা যায়, হাসিমুখে রিকশায় বসা মেয়রকে ময়লা পানি ঠেলে নিয়ে আসছেন চালক। পেছন থেকে একজন রিকশাটি ঠেলছিলেন।