‘ঈদের চান (চাঁদ) দেখলে যেমন খুশি লাগে, মনে হয় সেই চান (চাঁদ) আমার হাতে। ধানে এত ফলন হতে পারে- না করলে বিশ্বাসই করতাম না।’

বিনা ধানের নতুন জাতের আবাদ করে অবিশ্বাস্য ফলন পেয়ে ঢাকা মেইলকে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন মাগুরার সদর উপজেলার মঘী গ্রামের কৃষক আবুল কালাম। তার ভাষ্য- বিনা ধানের নতুন এই জাতে যেন ‘ঈদের চাঁদ’ পেয়েছে কৃষকরা।

সারাদেশে চলছে বোরো কাটার ধুম। ইতোমধ্যেই দেশের ৬০ ভাগ এলাকার বোরো ধান কাটাও শেষ হয়েছে। যারমধ্যে বোরোতে অনেক জেলাতেই এবার কৃষকরা বিনা ধানের নতুন একটি জাত আবাদ করেছেন। জাতটির উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)। যার নাম দেওয়া হয়েছে বিনা ধান-২৫।

বিনা ধানের নতুন এই জাতের আবাদ করতে গিয়ে কৃষকরাও দেখছেন বড় সাফল্য। অন্য জাতের চেয়ে এতে খরচ যেমন কম হচ্ছে, তেমনি ফলনও হচ্ছে বেশি। ফলে বিনার নতুন এই জাতকে এখন ঈদের চাঁদই মনে করছেন কৃষকরা। কারণ, ঈদের চাঁদ উঠলে ঘরে ঘরে যে খুশির বার্তা ছড়ায়, এ বছর যারা বোরোতে বিনা ধান-২৫ চাষ করেছেন তাদের ঘরেও এখন তেমন খুশির জোয়ার চলছে।

কৃষকরা জানিয়েছেন, গোলা ভরে উঠেছে বিনা ধান-২৫। বিনার নতুন এই জাতটি চিকন হওয়ায় দেখতেও সুন্দর, আবার বাজারে এর দামও একটু বেশি। এছাড়া একই জমিতে এই ধান চাষে অন্যবারের চেয়ে এবার খরচও লেগেছে কম। আবার প্রতি বিঘায় (৩৩ শতাংশ ধরে) ২৩ থেকে ২৮ মন বা তারও বেশি ধান পাওয়া যাচ্ছে। সবমিলিয়ে তাই কৃষকদের বাড়িতে বাড়িতে যেন চলছে ঈদের আনন্দ। সরেজমিনে মাগুরা জেলার বিভিন্ন এলাকায় আবাদ হওয়া বিনা ধানের নতুন এই জাতের প্রদর্শনী মাঠগুলো ঘুরেও এর প্রমাণ মিলেছে।

মাথার উপরে সূর্য বিলিয়ে দিচ্ছিল কড়া রোদ। তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালেও তীব্র রোদেই মাঠের ফসলের দেখভাল করছিলেন মাগুরার মঘী গ্রামের কৃষক মো. রশিদ। কথা হলে ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার চাচা এবার নতুন জাত আবাদ করেছে। কিছু জমির ধান কাটছে, এত ফসল হইছে দেখলে মন ভইরা যায়। এখনো কিছু ধান কাটে নাই। আমি সিদ্ধান্ত নিছি আমার আড়াই বিঘা জমি আছে, আগামীতে করব। এবার এত ঝড় গেছে এই জমিতে কিন্তু দেখেন- লম্বা ধানগাছ তবুও কিছু হয়নাই। আমরা যারা চাষবাষ করি, তাদের গরুর জন্য খড়ও প্রয়োজন হয়। এই ধান লম্বা হওয়ায় গরুর খাবার হিসেবে খড় পাব বেশি।

৬১ বছর বয়সী কৃষক আবুল কালাম আজাদের উচ্ছ্বাস আরও বেশি। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, আমার দুই ছেলে চাকরি করে। আমি এখানে কৃষিকাজ করি। এবার বিনা উপকেন্দ্র থেকে এই জাত (বিনা-২৫) পাই। ৫০ শতাংশ জমিতে চাষ করেছি। একটু শেষে পেয়েছিলাম, যদি আরও আগে পেতাম আরও ফলন ভালো হতো। এরপরও যে ফলন, তা অন্যবার এখানে যা লাগিয়েছিলাম তার চেয়েও বেশি।

মাগুরার এই কৃষক জানান, যেহেতু চিকন ধান তাই এই ধানে সার-কীটনাশক একেবারেই কম লাগে। স্বল্প মেয়াদের ধান। এখন পর্যন্ত যা কাটা হয়েছে, সেখানে একর প্রতি ৭৫ মণ পেয়েছি। অন্য জাতের ধানের চেয়ে বাজারে এর দামও বেশি।

কত খরচ হয়েছে জানতে চাইলে রীতিমতো খাতা-কলমে হিসেব কষে দেখান তিনি। সে অনুযায়ী, আনুমানিক ৫০ শতাংশ জমিতে ধান কাটাসহ হিসেব করলে সাড়ে ১২ হাজার টাকা বা ১৩ হাজারের মতো খরচ হয়। এ ক্ষেত্রে প্রায় ৩৭ মন ধান হবে যা বাজারে ১ হাজার ৩৫০ টাকা মণপ্রতি বিক্রি হচ্ছে। এই হিসেবে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ধান বিক্রি হবে।

মাগুরার এই কৃষকের সঙ্গে আলাপকালে আশপাশের আরও কয়েকজন কৃষকও কথা বলতে এগিয়ে আসেন। আলম মোল্লাসহ বেশ কয়েকজন জানান, তাদের অনেকেই এবারই বিনা-২৫ আবাদ করেছেন, আবার কেউ আগামীতে করবেন বলেও জানান। তবে ধান গাছ এবং ফলন দেখে তারা সবাই বেশ খুশি। তাদের ভাষ্য- আমাদের কাছে একটা সিজনে (মৌসুমে) ভালো ফলন পাইলে, পরেরবার সেই ধান আবার চেষ্টা করি। এই জাতে ফলন বেশি, তাই খুশিটাও বেশি।

একই জেলার মোহাম্মদপুর উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের ভাতুয়াডাঙা গ্রামের আব্দুল বারিক মৃধা ৭০ শতক জমিতে চাষ করেছেন বিনা ধান-২৫। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিনার কর্মকর্তারা উপস্থিত হয়ে তার প্রদর্শনী মাঠের ধান কর্তন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। আব্দুল বারিক মৃধা ঢাকা মেইলকে বলেন, স্যারদের পরামর্শে এবার এই জাতটি লাগাই। ফলন দেখে মনটা ভরে গেছে। আশপাশে অনেকেই যারা এর আগে কেটেছে, এত ফলন আগে আমরাই দেখিনি। আর খরচও কম, আবার কাচা ধানেরও বেশ ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে।

মাগুরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে তথ্যমতে, চলতি বছর মাগুরায় মোট ৩৯ হাজার ৪৩৬ হেক্টর পরিমাণ জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে বিনা-২৫ জাতের ধানের আবাদ হয়েছে বেশিরভাগ জমিতে। যারমধ্যে অনেক স্থানে ইতোমধ্যেই ধান কাটা শেষ, আবার কোথাও এখনো চলছে।

বিনার উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের এই কর্মকর্তা বলেন, ২০১৯ সাল থেকে আমি এটিকে নিয়ে কাজ শুরু করি, নতুনভাবে গবেষণা করি। পিউর লাইন সিলেকশন করি। পিউরিফাই করে আবার অবমুক্ত করতে আবেদন করি এবং ২০২২ সালে এটি মাঠপর্যায়ে সারা দেশের কৃষকদের জন্য অবমুক্ত হয়। এবারই প্রথম মাঠপর্যায়ে চাষ হচ্ছে।

ড. সাকিনা খানম জানান, কৃষকদের কাছে এটি ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। কারণ, এটি উচ্চ ফলনশীল ধানের একটা প্রিমিয়াম কোয়ালিটি। দেশে যতগুলো ধানের জাত আছে তার মধ্যে সবচেয়ে সরু এবং লম্বা একটি ধান। অনেকটা বাসমতির মতো। এর গড় ফলন ৭ দশমিক ৫ তবে উপযুক্ত পরিচর্যায় ৮ দশমিক ৫ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এটি স্বল্প মেয়াদি এবং সার-সেচ-কীটনাশক সবই কম লাগে এতে। আমরা এটিকে সার, পানি এবং বালাইনাশক সাশ্রয়ী বোরো ধানের জাত বলতে পারি।

বিনার উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের অপর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিনা ধান-২৫ চাষে অধিক মাত্রায় এর ফলনের পাশাপাশি খড়ও পাবেন কৃষকরা। কারণ, এর গড় উচ্চতা ১১৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত। ফলে ধানের বেশি ফলনের পাশাপাশি গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে খড়ও পাচ্ছেন কৃষকরা। এতে দুইভাবেই কৃষকরা উপকৃত হবেন।

এদিকে, শস্যভাণ্ডার খ্যাত নাটোরের চলনবিলেও নতুন উদ্ভাবিত বিনা-২৫ ধানের ফলনও হচ্ছে বিঘায় ২৩ মণের বেশি। চারা রোপণ থেকে ১৩৭ দিন পর প্রদর্শনী খামারে শস্য কর্তন করে এই ফলনের চিত্র পাওয়া গেছে। শস্য কর্তনকালে এলাকার অসংখ্য কৃষক নতুন উদ্ভাবিত ধানের সঙ্গে পরিচিত হতে চাষি খুরশেদ আলমের প্রদর্শনী খামারে ভিড় করেন।

ধানের নতুন এই জাতের আবাদ করা কৃষক খুরশেদ আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, এই জাতের ধান চাষাবাদে খরচ অন্যান্য ফসলের চেয়ে কম। বাজারে এর দাম একটু বেশি পাওয়া যাচ্ছে।

একই কথা জানিয়েছেন নাটোরের সিংড়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ সেলিম রেজা। তিনি জানান, প্রদর্শনী খামারের শস্য কর্তনকালে উপস্থিত কৃষকের আগ্রহ দেখে আমরা অভিভূত। ফলাফলও অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এই জাত ভবিষ্যতের জন্যে অনেক সম্ভাবনাময়।

বিনা ধান-২৫ এর বৈশিষ্ট্য

বিনার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বোরো ধানের এই জাতটি প্রিমিয়াম কোয়ালিটি/উন্নত গুণাগুণ (অতি লম্বা ও সরু) সম্পন্ন উচ্চ ফলনশীল, আলোক অসংবেদনশীল ও স্বল্পমেয়াদি (১৩৮-১৪৮ দিন)। এ জাতের ডিগ পাতা খাড়া, সরু ও মধ্যম, রং গাঢ় সবুজ। ধান পরিপক্ক হওয়ার পরও ডিগাপাতা গাঢ় সবুজ এবং খাড়া থাকে। পাশাপাশি এই জাতের গাছ লম্বা হলেও শক্ত তাই হেলে পড়ে না।

পূর্ণ বয়স্ক গাছের উচ্চতা ১১৬ সেন্টিমিটার। আরও প্রতি গাছে ১০-১২টি কুশি থাকে। এরমধ্যে প্রতি শীষে পুষ্ট দানার পরিমাণ ১৫০-১৫৫টি। আর ১ হাজার পুষ্ট ধানের ওজন গড়ে ১৯ দশমিক ৭ গ্রাম। এছাড়াও ধানের দানায় অ্যামাইলোজের পরিমাণ শতকরা ২৫ দশমিক ১ ভাগ এবং প্রোটিনের পরিমাণ শতকরা ৬ দশমিক ৬ ভাগ। ফলে ভাত সাদা, ঝরঝরে ও সুস্বাদু হয়। সেই সঙ্গে বাজারমূল্যও বেশি এবং এটি রফতানি উপযোগী।

এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব রবীন্দ্রশ্রী বড়ুয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের প্রচুর পরিমাণে সরু চাল বিদেশ থেকে আমদানি হয়। নতুন এই জাতের ধান থেকে বীজ সংরক্ষণ করা সম্ভব। এরই মধ্যে ৩৯৬ উপজেলাতে ৫ কেজি করে বীজ আবাদের জন্য সরবরাহ করা হয়েছে। আগামীতে এর পরিসর বাড়বে। সারাদেশে এই জাতের আবাদ করা গেলে আমদানি নির্ভরতা কমে আসবে। সেই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে। আমরা আশা করছি, খুব শিগগিরই দেশের চিকন চালের বাজার দখল করবে বিনা ধানের নতুন এই জাত।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা ব্রি ধান-২৯ এর মধ্যে রেডিয়েশন প্রয়োগ করেছি। এতে এর জেনেটিক পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তনের কারণে দুই সপ্তাহ আগাম হয়েছে ২৯ জাতের চেয়ে এবং এটা সরু।

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের এই কর্মকর্তা বলেন, আমাদের সরু চাল বিশাল আমদানি করতে হয়, ধানের নতুন এই জাতের ফলে সেটি কমে আসবে। সরু চালের এত ফলন বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত রেকর্ড। আমাদের উচিত দ্রুত এটি কৃষকদের মাঝে সম্প্রসারণ করা। বিএডিসি, ডিএই, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রি, বিনা সবাই মিলে ব্যাপকভাবে আগামী বোরোর জন্য মেগা পরিকল্পনা করছি।

বিষয়টিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে পরিচালক তাজুল ইসলাম পাটোয়ারি ঢাকা মেইলকে বলেন, ৩৯৬ উপজেলায় বিনা ধান- ২৫ ট্রায়াল করেছি। সব জায়গা থেকেই যে বার্তা পেয়েছি- ফলন হলো এভারেজ প্রায় হেক্টর প্রতি ৮ টনের মতো। সবচেয়ে ভালো গুণ হলো চাল চিকন, ধানের মধ্যে রোগ-পোকার আক্রমণ কম।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের এই কর্মকর্তা বলেন, যেখানে যেখানে এই জাতের চাষ করা হয়েছে, আমরা ইতোমধ্যেই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের বলেছি- বীজ সংগ্রহ করতে যেন পরে আমরা বিতরণ করতে পারি। পর্যায়ক্রমে এটি আমরা সারাদেশে ছড়িয়ে দেব।

সরকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ফসলের জাতের নতুনত্ব নিয়ে সারাবছরই কাজ করে যাচ্ছেন। বিনা ধান-২৫ সেই গবেষণার একটি অংশ হিসেবে সামনে এসেছে আশার প্রদীপ হয়ে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কৃষকরা এ বিষয়ে এখনো পুরোপুরি জানেন না, তারা এ বিষয়ে জানলে এবং এর আরও সম্প্রসারণ করা গেলে সরু চালের আমদানিই শুধু কমবে না; আগামীতে দেশের সরু চালের নেতৃত্বে থাকব ধানের নতুন এই জাত। সেই সঙ্গে কৃষকরাও অল্প খরচে অধিক ফলনে লাভবান হবেন। পাশাপাশি তারা বোরো আমনের মাঝেই অন্য ফসলও করতে পারবেন, যেখান থেকে বাড়তি আয়েরও সুযোগ থাকবে। সবমিলিয়ে দেশের জন্য একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে ধানের নতুন এই জাত।