বিশ্বের অনেক দেশ নিজেদেরকে অর্থনৈতিকভাবে মন্দা ঘোষণা করলেও বাংলাদেশের এর ধাক্কা লাগবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেজন্য নিজেদের প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একইসাথে গ্যাস-পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহারে সবাইকে সাশ্রয়ী ও মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আজ (শুক্রবার) সকালে রাজধানীতে বেগম রোকেয়া দিবস অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

করোনা মহামারি অভিঘাতের মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যুদ্ধেরর জের ধরে আমেরিকা-ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে বলে তিনি বলেন, ‘এটা শুধু আমাদের দেশে না। উন্নত দেশগুলো আরও খারাপ অবস্থায় আছে। সেজন্য আমি সবাইকে আহ্বান করেছি, যার যেখানে যতটুকু জায়গা আছে, যে যা পারেন উৎপাদন করুন। সাশ্রয় করেন, বিদ্যুৎ, পানি, তেল ব্যবহারে সবাই সাশ্রয়ী হোন। সবাই সঞ্চয়ী হোন, যেন আন্তর্জাতিক বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দার যে ধাক্কাটা এসেছে, সেই ধাক্কাটা যেন আমাদের দেশে না আসতে পারে। আমাদের নিজেদেরই সেই ব্যবস্থাটা নিতে হবে।’

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মানুষের কষ্ট হচ্ছে বলেও স্বীকার করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘কিন্তু এটা তো আন্তর্জাতিক একটা অবস্থার কারণে। আমরা যদি আমাদের উৎপাদন ঠিক রাখি, নিজেদেরটা নিজেরা করব, কারও কাছে হাত পেতে চলব না, ভিক্ষা করে চলব না। জাতির পিতা বলেছেন, মাটি আর মানুষ আছে। এই মাটি-মানুষ দিয়েই আমরা দেশ গড়ব।

‘এই চিন্তা থেকে যদি আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করি, সবাই যদি একটু মিতব্যয়ী হই, সাশ্রয়ী হই, ইনশাল্লাহ আন্তর্জাতিকভাবে অনেক উন্নত দেশ এখন নিজেদের অর্থনৈতিক মন্দার দেশ ঘোষণা দিয়েছে, বাংলাদেশ আল্লাহর রহমতে এখনও দেয়নি, দেয়া লাগবে বলে আমি মনেও করি না। কারণ আমরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে চলব, এগিয়ে যাব।’

সংসারের কাজকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘নারী যখন সংসারে কাজ করে, সেই কাজটাও কিন্তু কম নয়। এটাও কিন্তু তার একটা কর্মক্ষেত্র। সেখানে এটা হয়তো তার নিজের সংসার। সেখান থেকে সে হয়তো বেতনটা নিচ্ছে না, কিন্তু শ্রমটা দিচ্ছে। সংসার পরিচালনা করছে। সংসারের খুঁটিনাটি অনেক কাজ, যে কাজে তাকে সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হয়।’

সাংসারিক কাজকে শ্রম হিসেবে বিবেচনা করতে হবে জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘আমাদের নারীরা যারা বাইরে কাজ না করে সংসারে কাজ করে, একটা সংসার গুছিয়ে সুন্দরভাবে করা এটাও কিন্তু অনেক কাজ। এটাও তাদের কর্মক্ষেত্রে হিসেবে এবং এটা তাদের একটা শ্রম হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অনেকে গবেষণা করেন, মেয়েরা কোথায় কোথায় কাজ করছে। এই জায়গাটা কিন্তু যেখানে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয় সে জায়গটাকে কর্মক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। আমার মনে হয় এটা ঠিক না। এটা গণ্য করা উচিত।’

কর্মজীবী নারীদের অফিস সামাল দিয়ে বাসায় ফিরেও সব কাজ করতে হয় বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘হয়তো দেখা গেল স্বামী-স্ত্রী একইসঙ্গে অফিস থেকে ফিরল। স্বামী টায়ার্ড চেয়ারে বসে গেছে। আর নারী ছুটল পাকের ঘরে, হয়তো চা বানাতে, রান্না করতে, বাচ্চাদের খাওয়াতে, বাচ্চাদের গোসল করাতে, বাচ্চাদের খবর নিতে। সেখানে আমি সব সময় বলব, এখানে যদি সবাই মিলে কাজটা ভাগ করে নেন তাহলে কিন্তু… এতে লজ্জারও কিছু নেই, কোনো কিছু না…।’

নিজ পরিবারের উদাহরণ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কারণ আমি আমার পরিবারে দেখি, আমার ছেলেকে দেখেছি। আমার ছেলে, ছেলের বউ কাজ থেকে আসলেই আমার বউমা রান্না করে, আমার ছেলে ঘর পরিষ্কার করে। রান্নার পর চুলা পরিষ্কার করা, টেবিল পরিষ্কার করা, থালা-বাসন ধোয়ার কাজ আমার ছেলে নিজ হাতে করে। তারা কিন্তু ভাগ করে নেয়। বলে যে তাড়াতাড়ি করে ফেলে একসঙ্গে বসে তখন তারা টেলিভিশন দেখে। সমানভাবে কাজ করলে পরে এতে কোনো ক্ষতি নেই তো। বরং আরও একটু সময় পাওয়া যায়, পরিবারকে সময় দেয়া যায়। নিজের কাজটা নিজের সবারই করা উচিত বলে আমি মনে করি।’

বেগম রোকেয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি যদি সেই অচলায়তন ভেঙে নিজে শিক্ষা গ্রহণ করে আমাদের মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা না করতেন তাহলে আজ আমরা যে যেখানে আছি কোথাও থাকতে পারতাম না। সেই যুগটা ছিল অত্যন্ত কঠিন একটা পর্দার যুগ।’

বিচার বিভাগসহ সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী এবং বর্ডার গার্ডেও নারীদের অন্তর্ভুক্তি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই নিশ্চিত হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কোনো কোনো ক্ষেত্রে তো মনে হয় যেন ছেলেদের থেকেও আমাদের মেয়েরা বেশি স্মার্ট। না, ছেলেরা তো আমাদের অনেক স্মার্ট। এতে মন খারাপ করার কিছু নেই (হাসতে হাসতে)।’

প্রতিকূলতা ঠেলে প্রথম নারী সচিব এবং প্রথম নারী পুলিশ সুপারেরও নিয়োগ নিজ হাতে দিয়েছিলেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমার সৌভাগ্য হলো, রৌশন আরা, যাকে আমি প্রথম এসপি করেছিলাম, প্রথম মুন্সিগঞ্জে দিলাম। মুন্সিগঞ্জে প্রথম ডিউটিতে যেয়েই সে ডাকাত ধরে ফেলল। সেই ডাকাত ধরার ছবি, একেবারে এক হাতে রিভলবার, আরেক হাতে ডাকাতকে ধরে রাখছে, নৌকার ওপর দাঁড়িয়ে। আমার তো গর্বে বুকটা ভরে গেল। দেখলেন তো আমাদের মেয়েরা কী পারে! এই ডাকাতকে আজ পর্যন্ত…কই এত পুরুষ…(হেসে ফেলেন প্রধানমন্ত্রী) আমার ভোট যাচ্ছে…’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার কথাটা হচ্ছে সুযোগ সৃষ্টি করে না দিলে আসলে দায়িত্ব না দিলে দায়িত্ব পালন করে তার দক্ষতা দেখাবে কী করে? আর এটাও তো ঠিক, এটাও মনে রাখতে হবে, একটা সমাজের অর্ধেকই হচ্ছে নারী। কাজেই সেখানে নারী-পুরুষ যদি একইসঙ্গে সমানতালে একটা দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে না যায় সেই দেশ তো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। তাহলে তো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হয়।’

পর্বতারোহণ, ফুটবল, ক্রিকেটসহ ক্রীড়া খাতের নানা শাখায় নারীদের অগ্রগতি নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

নারী ও শিশু নির্যাতন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা মেয়েদের ওপর পাশবিক অত্যাচার করবে তাদের একেবারে ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট দেয়া হবে। অ্যাসিড নিক্ষেপসহ এ দুটোর জন্য আমরা আইন করেছি। যদিও এই আইন আন্তর্জাতিকভাবে অনেকে আপত্তি করে। কিন্তু মেয়েদের সুরক্ষার জন্য এটা একান্তভাবে প্রয়োজন বলেই আমরা সেই আইন করে দিয়েছি।’

মাতৃত্বকালিন ছুটি বেতনসহ ছয় মাস করে দেয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এখন থেকে যত প্রতিষ্ঠানই হোক সেখানে ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা, এমনকি গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে বড় বড় হোটেল, শপিংমল, সিনেমা হল—সব জায়গায় ডে-কেয়ার সেন্টার করাটা বাধ্যতামূলক করে দিতে হবে। সেই ব্যবস্থাটা আমরা করে দিয়েছি।

তৃতীয় লিঙ্গকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তৃতীয় লিঙ্গ—তারা তো কোনো অপরাধ করেনি। এরা তো বাবা-মায়েরই সন্তান। বাবা-মাকে ফেলে দিয়ে তাদের রাস্তায় চলে যেতে হবে কেন? তাদের জীবন জীবিকার কিছু থাকবে না, এটা তো হতে পারে না। সেজন্য নারী অধিকার, নারী অধিকার বলে অনেকেই আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু কখনও এই শ্রেণিটির কথা কেউ ভাবেননি, চিন্তা করেননি। কিন্তু আমরা সংবিধানেই তাদের স্বীকৃতি দিয়েছি।

‘সেই সঙ্গে তারা তাদরে বাবা মায়ের সঙ্গেই থাকবে, তারা লেখাপড়া শিখবে, তারা চাকরি পাবে, তারা কাজ পাবে, তারা ট্রেনিং পাবে, তাদের একটা সুস্থ জীবন তারা পাবে। এমনকি প্রতিটি ফর্মে শুধু নারী পুরুষ না, নারী, পুরুষ সেই সঙ্গে থার্ড জেন্ডার-সেটাও আমরা লাগিয়ে দিয়েছি।’

সম্পত্তিতেও তৃতীয় অধিকারের বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, ‘ইসলাম ধর্মে মেয়েদের সম্পদের অধিকার, মেয়েরা কিন্তু বাবার বাড়ির সম্পত্তির অধিকারও পায়, স্বামীর বাড়ির সম্পত্তির অধিকারও পায়। আবার সেই সঙ্গে তৃতীয় লিঙ্গ যারা, তারা যদি নিজেদের মেয়ে মনে করে থাকে মেয়ে যত অংশ পাবে তাই পাবে। যদি তারা ছেলে বা পুরুষালি, ছেলের যে অংশ পায়, তাই পাবে। সেটাও কিন্তু নির্দিষ্ট করা আছে, অন্তত আমাদের ইসলাম ধর্মে সেটা আছে, এইটুকু অন্তত আমি বলতে পারি। কাজেই সেভাবে আমরা তাদের স্বীকৃতি দিয়েছি।’