রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ জানিয়েছেন, তিনি রাষ্ট্রপতি পরিচয়ে নয়, বঙ্গবন্ধুর একজন সৈনিক হিসেবে পরিচয় দিতেই গর্ববোধ করেন। তিনি জানান, বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি। আর উত্থান হয়েছে তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে।
শুক্রবার (৭ এপ্রিল) বিকেলে জাতীয় সংসদের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘বিশেষ অধিবেশনে’ ভাষণ দানকালে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। এটাই রাষ্ট্রপতি হিসেবে সংসদে দেওয়া আবদুল হামিদের শেষ ভাষণ। পুরো ভাষণটি হুবহু তুলে ধরা হলো-.
জাতীয় সংসদের গৌরবোজ্জ্বল পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত এ বিশেষ অধিবেশনে উপস্থিত থাকতে পারা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গৌরবের। এ জন্য আমি পরম করুণাময় আল্লাহ্র নিকট শোকরিয়া আদায় করছি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি আনন্দঘন ও অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। এ মহান প্রতিষ্ঠানের ‘সুবর্ণজয়ন্তী’-তে ভাষণ প্রদানের সুযোগ করে দেয়ার জন্য আমি আপনাকে এবং আপনার মাধ্যমে মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।
ভাষণের শুরুতেই আমি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অমর শহিদদের, যাঁদের অসীম সাহস ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি একটি সার্বভৌম দেশ ও স্বাধীন জাতিসত্তা, পবিত্র সংবিধান ও একটি লাল-সবুজ পতাকা। আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি জাতীয় চার নেতা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান-কে যাঁরা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
আমি আরও স্মরণ করছি তাঁদেরকে, যাঁরা এ দেশের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের মর্যাদা সমুন্নত রাখার লড়াইয়ে আত্মত্যাগ করেছেন। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামের তিন মহান পুরুষ- শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী-কে যাঁদের অবদান আমাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
আমি পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি সেসব বিদেশি বন্ধুদের যাঁরা আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন। আমি পরম শ্রদ্ধায় আরও স্মরণ করছি ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডে শহিদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর সুযোগ্য সহধর্মিনী মহিয়সী নারী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব ও তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেলসহ সকল শহিদকে। আমি তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। আমি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করছি।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ও দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ০৭ এপ্রিল একটি ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭৩ সালের এই দিনে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছিল। সদ্য স্বাধীন দেশে যাত্রা শুরু হয়েছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের। তবে এই যাত্রার পেছনে রয়েছে ২৪ বছরের অত্যাচার, শোষণ ও নির্যাতনের করুণ ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে বৃটিশ পরাধীনতার হাত থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও বাঙালি জাতি আবারও পাকিস্তানের একটি প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তানে নতুন করে পাকিস্তানিদের পরাধীনতার কবলে পড়ে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪-তে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮-তে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধিকার আন্দোলন। ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে, ৩০ লক্ষ শহিদ ও দুই লক্ষ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি গণতন্ত্রের উন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দিতেন। তাই ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলেছেন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও তৎকালীন শাসকচক্রের চক্রান্তের জন্য সংসদে বসার সুযোগ হয়নি। বঙ্গবন্ধু ০৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। পাকিস্তানের সামরিক শাসক ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডেকে ০১ মার্চ তাঁর ভাষণে অনির্দিষ্টকালের জন্য তা স্থগিত করেন। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। জনগণ তাদের প্রাণপ্রিয় নেতার দিক্নির্দেশনার অপেক্ষায় প্রহর গুণতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালির আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করেন ‘‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’’ যা ছিল মূলত স্বাধীনতারই ডাক।
বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরেই পুনর্গঠন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে সংসদকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেন। ১৯৭২ সালের ২২ মার্চ রাষ্ট্রপতির ২২ নম্বর আদেশবলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে গণপরিষদ গঠন করা হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম ‘গণপরিষদ’ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭০-এর নির্বাচনে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যরা এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। প্রথম দিনের অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি হিসেবে বর্ষীয়ান নেতা মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের নাম প্রস্তাব করেন। তাঁর সভাপতিত্বে গণপরিষদের সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন এবং স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকার নির্বাচন করেন। গণপরিষদের প্রধান দায়িত্ব ছিল দেশের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করা।
১৯৭২ সালের গণপরিষদ এবং ১৯৭৩ সালের বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের সদস্যদের বেশিরভাগই আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। বর্তমান সংসদে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে জনাব তোফায়েল আহমেদ, আমি এবং প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে জনাব আমির হোসেন আমু, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, জনাব
মুহাঃ ইমাজ উদ্দিন প্রামানিক ও জনাব রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু জীবিত আছেন। হয়তোবা সারাদেশে ১৫ থেকে ২০ জন বেঁচে থাকতে পারেন। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর সাথে রাজনীতি করেছেন বা কাছে থেকে দেখেছেন তাঁদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। একইভাবে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী ও অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যাও দিন দিন কমছে। তাই জাতীয় সংসদের ইতিহাস নতুন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য এই বিশেষ অধিবেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। আমি আশা করি মাননীয় সংসদ সদস্যগণ তাঁদের বক্তব্যে সংসদের ইতিহাসের পাশাপাশি সংসদ পরিচালনায় বঙ্গবন্ধুর রীতিনীতি, কর্মকৌশল এবং স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেও দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবেন।
আমার নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবান মনে হয় যখন দেখি যে বর্তমান সংসদেও গণপরিষদ ও প্রথম জাতীয় সংসদে আমি যাঁদের সাথে সদস্য ছিলাম তাঁদের অনেকের ছেলেমেয়ে এমনকি নাতিরাও সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বাধীন বাংলাদেশে গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল ঢাকার তেজগাঁওস্থ সংসদ ভবনে শুরু হয়। গণপরিষদে ১৯৭২ সালের ০৪ নভেম্বর আমাদের সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ থেকে তা কার্যকর হয়। স্বাধীনতার এত অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান প্রণয়ন নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রকামী যেকোনো দেশের জন্য গর্বের। এই সংবিধানে প্রথম স্বাক্ষরকারী আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমি স্বাক্ষর করি ৭১ নম্বরে। এ সংবিধানের আওতায় প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ০৭ মার্চ। এর ঠিক এক মাস পর একই বছরের ০৭ এপ্রিল প্রথম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। আজ মহান জাতীয় সংসদের ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। সময়ের এ দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা সকল সময় মসৃণ ছিল না। গণতন্ত্রের পথে আমাদের অগ্রযাত্রা যখনই বাধাগ্রস্ত হয়েছে তখনই এর একটি প্রভাব পড়েছে জাতীয় সংসদের উপর। বিগত দেড় দশকে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। গত ১৪ বছরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র বলিষ্ঠ ও সুদৃঢ় নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার সকল যোগ্যতা অর্জন করেছে। তাঁরই নেতৃত্বে দেশের গণতন্ত্র আজ নিরাপদ ও সুরক্ষিত। বর্তমানে জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধি ব্যতীত অন্য কোনো গোষ্ঠী বা অসাংবিধানিক শক্তির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের সুযোগ নেই।
১৯৬৪ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। আমি তখন কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজের ছাত্র। পরিচয় থেকেই বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসা। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শের অনুসারী হয়ে যাই। বঙ্গবন্ধুর দিক্নির্দেশনায় কিশোরগঞ্জে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাই। মাঝে মধ্যে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হতো। অনেক সময় তিনি নিজেও ডেকে পাঠাতেন। সে সময়ে বঙ্গবন্ধুই ছিলেন আমার একমাত্র ধ্যান-ধারণা। তাঁর নীতি-আদর্শ ও নির্দেশনাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় বিষয়। শুধু আমি কেন, ঐ সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অনেক যুবকের কাছে বঙ্গবন্ধুই ছিলেন একমাত্র আদর্শ। যার পিঠে একবার বঙ্গবন্ধুর হাত পড়েছে বা স্নেহের ছোঁয়া লেগেছে তার পক্ষে বঙ্গবন্ধুকে ভুলে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এভাবে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সময় গড়াতে থাকে। পাকিস্তানি জান্তা সরকার ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। নির্বাচনের দিনক্ষণ এগিয়ে এলে বঙ্গবন্ধু আমাকে ডেকে পাঠান এবং নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়ার কথা জানান। জাতীয় পরিষদে না প্রাদেশিক পরিষদে মনোনয়ন দিবেন তা নিয়ে অনেক মজার গল্প আছে। যাই হোক সবশেষে বঙ্গবন্ধু আমাকে জাতীয় পরিষদে মনোনয়ন দিলেন। মাত্র ২৫ বছরের একজন যুবককে জাতীয় পরিষদের মতো এত বড়ো মাপের নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়ার সিদ্ধান্তে সেদিন অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। আমি নিজেও কম অবাক হইনি। কারণ তখনও আমি ছাত্র। আর আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়েই সবসময় ব্যস্ত থাকতাম। জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের কথা এর আগে আমার ভাবনায়ও আসেনি। বঙ্গবন্ধুর অপার স্নেহ আর তাঁর দূরদর্শিতার কারণেই আমি আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছি। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু আমাকে মনোনয়ন না দিলে নিভৃত হাওরের আবদুল হামিদ হয়তোবা নিভৃতেই থেকে যেত। তাই রাষ্ট্রপতি হিসেবে নয় বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন সৈনিক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতেই আমি বেশি গর্ববোধ করি।
নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার পর জাতীয় পরিষদের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচার শুরু করলাম। বঙ্গবন্ধু নিজেও আমার নির্বাচনের প্রচারে এসে কয়েকটি জনসভা করলেন এবং বললেন ‘‘হামিদকে ভোট দিলেই আমাকে ভোট দেওয়া হবে।’’ আল্লাহ্র অশেষ রহমতে ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হলাম এবং এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালে গণপরিষদের সদস্য হই। ১৯৭৩-২০০৮ পর্যন্ত ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথম, তৃতীয় ও পঞ্চম সংসদে দায়িত্ব পালন করি। সপ্তম সংসদে ডেপুটি স্পীকার পরে স্পীকার, অষ্টম সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতা এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নবম জাতীয় সংসদে স্পীকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার দুর্লভ সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এ ছাড়া ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন এবং কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারিয়ান এসোসিয়েশনের বিভিন্ন পদেও আমাকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল।
আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল সময় কেটেছে শেরেবাংলা নগরের উন্মুক্ত সবুজ পরিসর ও মনোরম জলাধারে ঘেরা মার্কিন স্থপতি লুই আই কানের অনন্যসাধারণ সৃষ্টি, পৃথিবীর অন্যতম দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা এই জাতীয় সংসদ ভবনে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে আজকের এই ভাষণটি মহান জাতীয় সংসদে আমার শেষ ভাষণ।
ছাত্র হিসেবে খুব একটা ভাল ছিলাম না এটা অনেকেরই জানা। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ইচ্ছা থাকলেও প্রথমবারে তা হয়নি। পরবর্তী সময়ে খেলোয়াড় কোটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি চূড়ান্ত করি। আগ্রহ নিয়ে সাফল্যের খবরটি বঙ্গবন্ধুকে জানাতে তাঁর সঙ্গে দেখা করি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি করার আগ্রহ প্রকাশ করি। আশা ছিল নেতার কাছ থেকে কিছুটা হলেও বাহবা পাব। কিন্তু ফল হলো একেবারে উল্টো। সব শুনে বঙ্গবন্ধু ভারি গলায় বললেন, ‘‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তোর ভর্তি বাতিল। কিশোরগঞ্জে থেকে তোকে রাজনীতি করতে হবে।’’ কাছাকাছি থাকা তোফায়েল ভাইকে ডেকে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘‘হামিদকে সেন্ট্রাল ল’কলেজে ভর্তি করে বইখাতা দিয়ে কিশোরগঞ্জে পাঠানোর ব্যবস্থা কর।’’ আমার জীবনে বঙ্গবন্ধুর কথাই শেষ কথা। সেই থেকে কিশোরগঞ্জকে কেন্দ্র করেই আমার আইন পেশা ও রাজনীতির বিচরণ। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলেও পরিচয় ও আলাপচারিতার মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ ছিল। কিশোরগঞ্জই আমার রাজনীতির চারণভূমি।
১৯৯৬ সালে সাধারণ নির্বাচনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করলে তিনি আমাকে ডেপুটি স্পীকার পদে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নেন। শুনেছি এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে দু-একজন ছাড়া তৎকালীন অনেক কেন্দ্রীয় নেতাই না-কি মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘‘হামিদ সাব কখনো কেন্দ্রীয় রাজনীতি করেন নাই।’’ কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবকিছু উপেক্ষা করে আমার উপর আস্থা রেখেছিলেন। আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেদিন আমাকে ডেপুটি স্পীকার পদে মনোনয়ন না দিলে হয়তোবা কিশোরগঞ্জকে ঘিরেই আমার রাজনীতি আবর্তিত হতো। বঙ্গবন্ধুর হাতে হয়েছিল আমার রাজনীতির হাতেখড়ি ও প্রথম উত্থান। আর ৯৬’তে দ্বিতীয় উত্থান ঘটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে এবং তাঁরই উদ্যোগে।
জাতীয় সংসদ গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মূল কেন্দ্রবিন্দু। জনগণের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সর্বোচ্চ এ প্রতিষ্ঠান জনগণের আশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে জনমত ও প্রত্যাশাকে ধারণ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের চাহিদার প্রতি সংবেদনশীলতা এবং দৈনন্দিন নাগরিক জীবনের জরুরি ও জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানে সংসদ কার্যকর ভূমিকা পালন করবে এটাই জনগণ আশা করে। সমাজের সকল স্তরের নাগরিক, বিভিন্ন গোষ্ঠী, দল, সংগঠনের চাওয়া-পাওয়া ও স্বার্থকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সমন্বয়সাধন করতে হয় জাতীয় সংসদকে। মাননীয় সংসদ সদস্যগণ জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। তারা অনেক আশা নিয়ে আপনাদের নির্বাচিত করেছেন যাতে তাদের কথা, চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাঙ্ক্ষা আপনারা সংসদে তুলে ধরেন। এটা আপনাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং নীতি-আদর্শের ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু সংসদকে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার ক্ষেত্রে কোনো ভিন্নতা থাকতে পারে না। তাই আপনাদের প্রতি আমার আকুল আহ্বান সংসদকে কার্যকর করতে ঐক্যবদ্ধ হোন।
সার্বিকভাবে আমাদের সংসদের মূল তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও ভূমিকা রয়েছে-প্রথমত, সমাজের সকল শ্রেণি, পেশা, জেন্ডার, মত ও পথের প্রতিনিধিত্বকরণ; দ্বিতীয়ত, আইন প্রণয়ন ও সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিষয়াদি এবং তৃতীয়ত, তদারকির মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ। সংসদীয় পদ্ধতিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিসমূহকে সঠিকভাবে কার্যকর করা গেলে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
আমাদের অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জাতীয় সংসদে সকল স্তরের জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এটি অর্জনে আমাদের সবসময় সচেষ্ট থাকতে হবে। আমাদের সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। জনশক্তির এই ব্যাপক অংশকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে আমরা কখনও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবো না। সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে সরকার বহুবিধ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্যের আসন বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় জাতীয় সংসদে নারীদের অংশগ্রহণ অধিক অর্থবহ করার লক্ষ্যে সংবিধানে সংশোধনী আনা হয়েছে।
আইনসভায় প্রণীত আইনের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল এই আধুনিক সমাজের কল্যাণে নতুন ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করা জাতীয় সংসদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। প্রচলিত ধারা অনুযায়ী আইন প্রণয়নে সরকার যদিও উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করে কিন্তু সংসদের সম্মতি ব্যতীত কোনো আইন প্রণয়ন সম্ভব নয়। সংসদে বিল আকারে উপস্থাপিত একটি আইন প্রণয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে একজন সংসদ সদস্য ব্যক্তিগত কিংবা সমষ্টিগতভাবে প্রস্তাবে গুরত্বপূর্ণ সংশোধনী এনে আইন প্রণেতা হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন। সংসদে বিল আকারে উপস্থাপিত আইন নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করলে আইনের গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। মাননীয় সংসদ সদস্যদের এই কাজটি খুবই মনোযোগ দিয়ে করতে হবে। অন্যথায় আইন পাসের পরপরই সংশোধনীর জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। এ উদ্যোগ গ্রহণ না করলে আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে নানামুখী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে। জাতীয় সংসদে প্রথিতযশা আইনজীবীদের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে হয়তোবা সংসদে বিল আকারে উপস্থাপিত আইনের পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণের জন্য বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে।
উন্নয়ন ও গণতন্ত্র একসঙ্গে চলে। দেশে গণতন্ত্র অব্যাহত থাকলে উন্নয়ন ও অগ্রগতি এগিয়ে যায়। আবার গণতন্ত্রের স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ হলে উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হয়। উন্নয়নকে স্থায়ী ও টেকসই করতে হলে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মজবুত করতে হবে, তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রের চর্চা ছড়িয়ে দিতে হবে। গণতন্ত্রহীন অবস্থায় যে উন্নয়ন হয় তা কখনো সার্বজনীন হতে পারে না। সে উন্নয়ন হয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরেই মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরে শূন্য থেকে দেশকে একটা স্থিতিশীল পর্যায়ে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতকচক্রের হাতে বঙ্গবন্ধু শহিদ না হলে দেশ অনেক আগেই উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হতো। ৭৫-এর পর উন্নয়ন ও গণতন্ত্র অনেকদিন অবরুদ্ধ ছিল। ফলে দেশ অনেক পিছিয়ে পড়ে। গত দেড় দশকে সরকার ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতার ফলে দেশ উন্নতি ও অগ্রগতির পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এখন আমাদের দায়িত্ব উন্নয়নের এই ধারাকে এগিয়ে নেয়া।
আজকে এই সংসদে দাঁড়িয়ে মনে পড়ছে আজ থেকে ৫০ বছর আগে জাতীয় সংসদের প্রথম সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদ নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নবনির্বাচিত স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকারকে অভিনন্দন জানিয়ে দেয়া বক্তব্যের কথা। সেদিন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘‘আপনার কর্তব্যপালনে সংসদের সদস্যবৃন্দ সবসময় আপনার সঙ্গে সহযোগিতা করবেন। আমি আশা করব, যে ট্র্যাডিশন পার্লামেন্টারি সিস্টেমে আছে, আপনি সেটার প্রতি লক্ষ্য রেখে নিরপেক্ষভাবে আপনার কার্য পরিচালনা করবেন। আমাদের কাছ থেকে আপনি সাহায্য ও সহযোগিতা পাবেন। এই সংসদের মর্যাদা যাতে রক্ষা পায়, সেদিকে আপনি খেয়াল রাখবেন, কারণ আমরা যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছি, সে ইতিহাসে যেন খুঁত না থাকে। দুনিয়ার পার্লামেন্টারি কনভেনশনে যে সব নীতিমালা আছে, সেগুলো আমরা মেনে চলতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে যেন এমন একটি parliamentary procedure follow করতে পারি, যাতে দুনিয়া আমাদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। এখানে কোন দল বা মতের নয়- এখানে এই দেখব যে, প্রত্যেক সদস্য যেন যাঁর যে অধিকার আছে, সে অধিকার ব্যবহার করতে পারেন। সেদিকে আপনিও খেয়াল রাখবেন বলে আমি আশা পোষণ করি। এ সম্পর্কে আপনি আমাদের পূর্ণ সহযোগিতা পাবেন। parliamentary tradition পুরোপুরি follow করতে আমরা চেষ্টা করব।’’
গণপরিষদে কোনো বিরোধী দল না থাকলেও সংসদ অধিবেশন হতো প্রাণবন্ত। যুক্তিতর্ক ও মতামত উপস্থাপন ছিল খুবই আকর্ষণীয়। ন্যাপ থেকে নির্বাচিত একমাত্র গণপরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পার্লামেন্টে বক্তৃতা করার সুযোগ চাইলে সবসময়ই সুযোগ পেতেন। স্পীকার মাঝে মধ্যে তাঁকে মাইক দিতে না চাইলেও বঙ্গবন্ধু বলতেন ‘‘ওকে সুযোগ দেন, বিরোধী পক্ষের কথা আগে শুনতে হবে।’’ সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে কমিটি গঠন প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘‘শুধু যে আমাদের দলীয় সদস্য থেকে কমিটি করব তা নয়, দল-মত নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে আলোচনা করা হবে, জনগণকে যাতে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী একটা সুষ্ঠু সংবিধান দেওয়া যায়, এই উদ্দেশ্যে সকলের মতামত চাইব, এই সংবিধানে মানবিক অধিকার থাকবে, যে অধিকার মানুষ চিরজীবন ভোগ করতে পারবে।’’
বঙ্গবন্ধু সংসদ কার্যক্রমের পাশাপাশি দলীয় শৃঙ্খলাকে অগ্রাধিকার দিতেন। এ প্রসঙ্গে প্রথম অধিবেশনের প্রথম কার্যদিবসেই তিনি বলেছিলেন ‘‘আমি মাননীয় সংসদ সদস্যদের আর একটা কথা মনে করিয়ে দিতে চাই যে, কোনো প্রস্তাব আনার আগে পার্টিতে তা আলোচনা করে তারপর উপস্থাপন করবেন। তা না হলে এর দ্বারা পার্টির শৃঙ্খলা নষ্ট হবে।’’
সংসদ সদস্যদের অভাব-অভিযোগ, সুখ-দুঃখ সবকিছুর খবর রাখতেন বঙ্গবন্ধু এবং প্রয়োজনে তাদের জন্য সম্ভাব্য সবকিছুই করতেন। বর্তমান আইনমন্ত্রী জনাব আনিসুল হকের বাবা মরহুম সিরাজুল হক সংসদে ফ্লোর পেলেই ইংরেজিতে বক্তৃতা শুরু করতেন। স্পীকারও সঙ্গে সঙ্গে মাইক বন্ধ করে দিতেন। তিনি আবারও ফ্লোর চাইতেন কিন্তু ফ্লোর পেলেই ইংরেজিতে বক্তৃতা আরম্ভ করতেন। আবারো মাইক বন্ধ হয়ে যেতো। এই অবস্থা দেখে সংসদ নেতা বঙ্গবন্ধু নিজেই দাঁড়িয়ে বললেন, ‘‘মাননীয় স্পীকার তাঁকে ইংরেজিতেই বলার অনুমতি দিন।’’ স্পীকার বললেন, ‘‘মাননীয় সংসদ নেতা তিনি তো ইংরেজিতে বলার অনুমতি চাননি।’’ তখন বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘‘মাননীয় স্পীকার তাঁর হয়ে আমিই অনুমতি চাচ্ছি।’’ পরে মরহুম সিরাজুল হক ইংরেজিতেই তাঁর বক্তব্য দিয়েছিলেন।
আমি একদিন রিক্সায় করে সংসদে (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়) যাচ্ছি। কিন্তু গেইটে যেতেই নিরাপত্তা প্রহরী রিক্সা থামিয়ে দিয়ে বলল রিক্সা ভেতরে যাবে না। কিন্তু গাড়ী ঢুকছে অবলীলায়। নিরাপত্তা রক্ষীকে অনেক যুক্তিতর্ক দিয়েও কাজ না হলে রিক্সা ছেড়ে পায়ে হেঁটেই সংসদে প্রবেশ করি এবং তাৎক্ষণিকভাবে সমস্ত ঘটনা উল্লেখ করে আমার অধিকার ক্ষুণ্নের একটি নোটিশ জমা দেই। একদিন পরেই তৎকালীন চীফ হুইপ মরহুম শাহ মোয়াজ্জেম আমাকে নোটিশ প্রত্যাহারের জন্য অনুরোধ করেন। আমি প্রত্যাহারে রাজি না হলে কিছুক্ষণ পরেই সংসদ নেতা বঙ্গবন্ধু নিজেই আমাকে ডেকে বললেন, ‘‘কীরে তোর কী হয়েছে?’’ আমি বললাম, গাড়ীতে যারা আসে তাদেরকে যেমন ড্রাইভার নিয়ে আসে তেমনি আমাকেও রিক্সার ড্রাইভার নিয়ে আসে। কিন্তু গাড়ী ঢুকতে কোনো বিধি- নিষেধ না থাকলেও রিক্সা নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না এটাতো ঠিক না। তাই আমি অধিকার ক্ষুণ্নের নোটিশ দিয়েছি এবং আমি প্রত্যাহার করতে চাই না। বঙ্গবন্ধু সব শুনে পিঠে একখান কিল মেরে বললেন, ‘‘আচ্ছা এখন তুই নোটিশ তুইলা ফালা। তোরতো গাড়ী নাই। দেখি কী করা যায়।’’ পরে অবশ্য একটা পুরোনো গাড়ীর ব্যবস্থা হয়েছিল। যদিও সেটি কিনতে এবং মেরামত করতে নতুন গাড়ী কেনার সমানই খরচ হয়েছিল। এভাবেই বঙ্গবন্ধু সকল সংসদ সদস্যের অভাব-অভিযোগ ও দাবি-দাওয়ার খেয়াল রাখতেন।
পার্লামেন্টে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে স্পীকার অনেক সময় বিব্রত হতেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু হতেন না। ১৯৭৩ সালে পার্লামেন্টে আতাউর রহমান খান, এমএন লারমাসহ বিরোধী দলের কয়েকজন এমপি ছিলেন। তখনও দেখেছি তারা কথা বলতে চাইলেই সুযোগ পেতেন এবং বঙ্গবন্ধুই স্পীকারকে বলে সে সুযোগ করে দিতেন। এটা ছিল বিরোধী দলকে আস্থায় নেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর একটি গণতান্ত্রিক কৌশল। রাজনৈতিক মতাদর্শের যত অমিলই থাকুক না কেন বঙ্গবন্ধু বিরোধী দলের নেতাদের যথাযথ সম্মান দিয়ে কথা বলতেন। আসলে রাজনীতিতে শিষ্টাচার ও পরমত সহিষ্ণুতার কোনো বিকল্প নেই।
সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। সংসদে সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যদের সমর্থন ও মতামতের উপর নির্ভরশীল। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের কার্যক্রম তদারকির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ‘নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য’ প্রতিষ্ঠা করা সংসদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দক্ষ ও নিবিড় তদারকির মাধ্যমে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা সংসদকে অধিক কার্যকর করে যা চূড়ান্তভাবে সামগ্রিক জনকল্যাণকেও নিশ্চিত করে। এক্ষেত্রেও একজন সংসদ সদস্য ব্যক্তিগত কিংবা সমষ্টিগতভাবে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে সন্নিবেশিত বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে সংসদের নিকট সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারেন।
প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক এই যুগে বিশ্বের সর্বত্র আইনসভা তার মূল কার্যক্রম বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে সম্পাদন করে থাকে, আমরাও এর ব্যতিক্রম নই। সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রাণ হচ্ছে এই সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থা। মিনি পার্লামেন্ট হিসেবে পরিচিত সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থার কার্যকারিতার উপর সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি রচিত। আধুনিকীকরণ তথা শিল্পোন্নয়নের কারণে রাষ্ট্রের কার্যক্রম ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে আনীত খসড়ার উপর সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থায় সংসদ সদস্যদের অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র গ্রুপে তথা বিশেষজ্ঞসুলভ বিবেচনা ও পর্যালোচনা করার প্রয়োজন হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহে সংসদীয় কমিটি বিভিন্ন বিল ও প্রস্তাব পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিচার-বিশ্লেষণ করে আইনসভার নিকট রিপোর্ট উপস্থাপন করে। এর ফলে সংসদের সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি কার্যসম্পাদন সহজতর হয়। এভাবে আইন প্রণয়নসহ সংসদের সকল দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ কমিটিসমূহের কার্যক্রমে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে একজন নবীন সংসদ সদস্য সংসদীয় রীতি ও কার্যপ্রণালী বিধির উপর জ্ঞান অর্জন করে নিজেকে দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন।
জাতীয় সংসদের কার্যক্রমকে প্রাণবন্ত ও কার্যকর করতে হলে সংসদ সদস্যদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। যুক্তিতর্কের সঙ্গে বিতর্কে অংশ নিতে হবে। সংসদ সদস্য হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হলে সংবিধান, কার্যপ্রণালী বিধি, সংসদীয় রীতিনীতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে হবে । এছাড়া সংসদের অতীত কার্যবাহ থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়। দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হতে হলে আপনাদের পড়াশোনার পাশাপাশি সংসদ লাইব্রেরির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে এখন আর সশরীরে লাইব্রেরিতে না গিয়ে অনলাইনে সবকিছু সংগ্রহ করা যায়।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ফসলই হচ্ছে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ও আমাদের এই জাতীয় সংসদ। তাই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে এই সংসদকে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা দলমত নির্বিশেষে আমাদের সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
গণতন্ত্র আমদানি বা রপ্তানিযোগ্য কোনো পণ্য বা সেবা নয়। মনে চাইলো কোনো দেশ থেকে পরিমাণমত গণতন্ত্র আমদানি বা রপ্তানি করলাম, বিষয়টি এমন নয়। চর্চার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র বিকশিত ও শক্তিশালী হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রতিটি আন্দোলন ও সংগ্রামে এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সংসদের কার্যবাহে সংসদ নেতা বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যগুলো পড়লে বুঝা যায় সংসদকে কিভাবে প্রাণবন্ত ও কার্যকর করতে হয়।
পরমতসহিষ্ণুতা, বিরোধী দলকে আস্থায় নেয়া এবং অন্যকে কিভাবে সম্মান দেয়া যায় এসব বিষয়ে বঙ্গবন্ধু বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় নজির রেখে গেছেন। আমাদের সৌভাগ্য আমরা বঙ্গবন্ধুর মতো একজন বিশ্বমানের কিংবদন্তি নেতা পেয়েছিলাম। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু আমাদের মধ্যে নেই কিন্তু তাঁর নীতি-আদর্শ আমাদের চিরন্তন প্রেরণার উৎস। তাঁর দেখানো পথেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় ও যোগ্য নেতৃত্বে বিগত দেড় দশকে দেশের প্রতিটি সেক্টরে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। করোনা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব সত্ত্বেও বিশ্বে যে কয়েকটি দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিতকল্পে সরকারের আর্থসামাজিক ও বিনিয়োগধর্মী নানামুখী প্রকল্প, কর্মসূচি এবং কার্যক্রম গ্রহণের ফলে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত বিপুল পরিমাণ রেমিটেন্স অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস, জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণ, গড় আয়ু বৃদ্ধিসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। দারিদ্র্যের হার কমার পাশাপাশি মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের শতভাগ জনগণ বিদ্যুৎ সুবিধা ভোগ করছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী দেশে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা সুরক্ষিত রয়েছে। জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় ভূমিহীন, গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আশ্রয়ণ, ভূমিহীনদের মধ্যে খাস জমি বিতরণ ও কর্মসংস্থান প্রভৃতি কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দেশের ভূমিহীন ও গৃহহীন বিশাল একটি জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। কদিন আগেও প্রায় চল্লিশ হাজার ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে বাড়ী তৈরি করে দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ২১১টি উপজেলাকে গৃহহীন ও ভূমিহীনমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে এবং ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২’ উৎক্ষেপণের বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দেশের সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে এবং ঢাকায় মেট্রোরেল চালু করা হয়েছে। পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ও রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজও নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।
গণতন্ত্র চর্চার প্রাণকেন্দ্র জাতীয় সংসদ। সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সরকারের সকল বিভাগের জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে আদর্শ স্থাপনের গুরুদায়িত্ব বর্তায় এ মহান সংসদের মাননীয় সংসদ সদস্যদের উপর। কেবল গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিতরাই সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব এবং জনগণের নিকট জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে। এ বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী উভয়পক্ষের মাননীয় সংসদ সদস্যগণই জাতির নিকট দায়বদ্ধ। এই উপলব্ধি থেকে হিংসা-বিদ্বেষ, ব্যক্তিগত এবং দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসে আমি এ মহান সংসদে মাননীয় সংসদ সদস্যদের গঠনমূলক, কার্যকর ও সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। ক্ষমতায় যাওয়া বা পরিবর্তন আনার একমাত্র উপায় নির্বাচন। আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস ও হিংসার রাজনীতি কখনো দেশ, সমাজ ও অর্থনীতির জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। বরং তা রাজনৈতিক পরিবেশকে তমসাচ্ছন্ন করে তোলে। সংঘাত ভুলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে এসে গণতন্ত্রকে বিকশিত হতে আমাদের সকলের সহায়তা করা উচিত। রাজনীতি থেকে হিংসা-হানাহানি অবসানের মাধ্যমে একটি সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে হবে। প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও মহান সংবিধানের আলোকে বাংলাদেশের জনগণ নিরপেক্ষভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চার ইতিহাসকে আরো সমৃদ্ধ ও বেগবান করবে- এটাই সকলের প্রত্যাশা।
জাতির বীর, সাহসী সূর্যসন্তানেরা লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমাদের একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ উপহার দিয়ে গেছেন। আমাদের দায়িত্ব এই দেশ ও জাতির অগ্রযাত্রাকে বেগবান করা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এই মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আমি আজ দলমত নির্বিশেষে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি- আসুন, সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে প্রিয় মাতৃভূমি থেকে সংঘাত-সংঘর্ষ এবং যেকোনো উগ্রবাদ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড হতে দূরে থেকে কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে শামিল হই। গণতন্ত্রকে বিপন্ন করে তোলে এমন যেকোনো অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে।
পৃথিবীর মানচিত্রে একটি আত্মমর্যাদাশীল, দেশপ্রেমিক জাতি হিসেবে আমাদের রয়েছে একটি অনন্য পরিচয়। সে পরিচয়কে আমাদের ঐকান্তিকতা, সততা ও কর্মনিষ্ঠা দিয়ে সমুন্নত রাখতে হবে। দেশের উন্নয়নে আমাদের চিন্তা, কর্মপদ্ধতি ও কৌশল ভিন্ন হতে পারে কিন্তু আমাদের মধ্যে সুগভীর ঐক্য থাকবে জাতীয় স্বার্থ ও দেশপ্রেমের প্রশ্নে। হিংসা-বিভেদ নয়, স্বার্থের সংঘাত নয় – আমাদের সামনে রয়েছে আজ দেশ গড়ার কাজ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা গড়ে দিয়ে যাব একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ – এই হোক আমাদের সকলের অঙ্গীকার।
আপনাদের সবাইকে আবারও আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা।
আল্লাহ হাফেজ
জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।