গ্রাহক পর্যায়ে ১২.৫ কেজির সরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ৪১০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে রাষ্ট্রীয় কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেড। প্রস্তাবনাটি কার্যকর হলে বর্তমান ৮২৫ টাকার সিলিন্ডারের দাম বেড়ে দাঁড়াবে ১২৩৫ টাকায়।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ ইউসুফ হোসেন ভুঁইয়া গণমাধ্যমকে দাম বাড়ানোর আবেদনের কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মূল্য নির্ধারণ কমিটির প্রস্তাবনার আলোকে আবেদন করা হয়েছে।

বিপিসির মালিকানাধীন বাংলাদেশ এলপি গ্যাস লিমিটেড এর আগে ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ১২.৫ কেজির দাম ৮২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯২৫ টাকা প্রস্তাব করেছিল। তখনও ক্রসফিলিং বন্ধ, ডিলার পর্যায়ে স্থানীয় পরিবহন, অপারেশন খরচ ও চার্জ বৃদ্ধির জন্য দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সেই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিল।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, আগের দফায় তারা ডিলারের কমিশন বাড়ানোর আবেদন করেছিল। ওই টাকা ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে যেতো। এবার তারা যে প্রস্তাব করেছে, সেই টাকা বিপিসি ও কোম্পানির কাছে যাবে।

এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। কমিশন যৌক্তিক মনে করলে গণশুনানিতে যাবে।

এলপি গ্যাস লিমিটেড তার আবেদনে বলেছে, একই পণ্যের দুই রকম দাম হওয়ায় নানামুখী সংকট তৈরি হচ্ছে। বেসরকারি কোম্পানির এলপিজির দাম অনেক বেশি (১৩৪১ টাকা) হওয়ায় ক্রস ফিলিং হচ্ছে (সরকারি সিলিন্ডার থেকে বের করে বেসরকারি সিলিন্ডার ফিলিং)। এতে করে ভোক্তা সরকারি এলপিজি পাচ্ছে না, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সঠিক দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রস্তাবে বেসরকারি এলপিজির মতো আন্তর্জাতিক বাজার দরের (সৌদি সিপি) সমান করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এক সময় এলপি গ্যাসের দাম বেসরকারি কোম্পানিগুলোর ইচ্ছাধীন ছিল। ক্যাবের এক রিটের কারণে অনেকটা বাধ্য হয়ে ২০২১ সালের ১২ এপ্রিলে এলপিজি দর নির্ধারণ করে বিইআরসি। প্রায় ৯৯ শতাংশ আমদানি নির্ভর এলপিজির দর ঘোষণা সময় বলা হয় সৌদি সিপিকে (চুক্তি মুল্য) ভিত্তিমূল্য বিবেচনা করা হবে। সিপির দর ওঠা-নামা করলে ভিত্তিমূল্য ওঠা-নামা করবে অন্যান্য কমিশন অপরিবর্তিত থাকবে। ঘোষণার পর থেকে প্রতিমাসে বেসরকারি এলপিজির দর ঘোষণা করে আসছে বিইআরসি।

তখন বলা হয়েছিল বেসরকারি কোম্পানিগুলো চড়াদামে আমদানি করলেও এলপি গ্যাস লিমিটেড দেশীয় গ্যাস ফিল্ড থেকে উপজাত হিসেবে অনেক কমদামে পেয়ে থাকে। সে কারণে বিইআরসি ফর্মুলা (না লোকসান না মুনাফা) অনুযায়ী এলপি গ্যাস লিমিটেডের দর ঘোষণা করা হয়। তখন ১২.৫ কেজির দাম ৬৯০ টাকা নির্ধারিত ছিল।

সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৪ মে গণশুনানি ছাড়াই ১২.৫ কেজির দাম ৬৯০ টাকা বাড়িয়ে ৮২৫ টাকা নির্ধারণ করে বিইআরসি। আর সেই ঘোষণার পর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ভোক্তাদের সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। এরপর থেকে বয়কট করে আসছে বিইআরসিকে।

তখন বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেছিলেন, সরকারি কোম্পানির এলপি গ্যাসের দামে কিছু প্যারামিটার রয়েছে। সেসব প্যারামিটারে পরিবর্তন এসেছে, সে কারণে দাম সমন্বয় করা হয়েছে।যেভাবে আমরা বেসরকারি এলপি গ্যাসের দাম প্রতিমাসে সমন্বয় করছি।

এলপি গ্যাস লিমিটেডের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২ হাজার ৭২৩ মে. টন এলপিজি বিক্রি করেছে। সেনাবাহিনীকে ৭২২ মে. টনসহ মোট ৮৩৪ মে. টন বাল্ক আকারে সরবরাহ দিয়েছে। অবশিষ্ট এলপিজি বোতলজাত করে বিক্রি করেছে কোম্পানিটি।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে করপূর্ব মুনাফা করেছে ১০ কোটি ২ লাখ টাকা, ডব্লিউপিপিএফ ৫০ লাখ এবং আয়কর বাবদ ৩ কোটি ১২ লাখ টাকা জমার পর করোত্তর নীট মুনাফা করেছে ৬ কোটি ৩৯ টাকা। বিইআরসি ফর্মুলা (না লোকসান না মুনাফা) অনুযায়ী দাম বাড়ানোর কতটা সুযোগ রয়েছে সে বিষয়ে রয়েছে বিস্তর বিতর্ক।

এলপি গ্যাস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া গণমাধ্যমকে বলেছেন, পণ্যটি বিপিসির তাদের পরামর্শ অনুযায়ী দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

দেশে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন এলপিজির চাহিদার বিপরীতে রাষ্ট্রীয় কোম্পানিটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাত্র ১২ হাজার ৭২৩ টন সরবরাহ দিয়েছে। যদিও সাধারণ ভোক্তা এই গ্যাস কখনই চোখে দেখতে পায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। বেশিরভাগ এলপিজি নিদিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ দেওয়া হয়, অল্প পরিমাণে বাজারে ছাড়া কথা বলা হলেও তা কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ অনেক পুরনো।

গত ডিসেম্বর থেকে এলপি গ্যাসের বাজারে অরাজকতা বিরাজ করছে। ১৩৪১ টাকার গ্যাস ১৮০০ টাকা থেকে ২২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের মতোই নতুন সরকারও এ বিষয়ে নিরবতা পালন করছে।