‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ অবলম্বনে আমার পরিচালনায় নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘একটি দেশের জন্য গান’ বা ‘Songs for a Country’ বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের সনদপত্র পেয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রামাণ্যচিত্রটি সর্বসাধারণের মাঝে প্রদর্শনের জন্য অনুমোদন দিলো তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশকে ঘিরে প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছেন লেখক ও সাংবাদিক শামীম আল আমিন। যার ইংরেজি নাম দেয়া হয়েছে ‘সংস ফর এ কান্ট্রি’।

একটি দেশের জন্য গান’ কোনো সাধারণ প্রামাণ্যচিত্র নয়। এর সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের আবেগ ও ভালোবাসা। পঞ্চাশ বছর আগে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পক্ষে নিউইয়র্কের মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে কনসার্ট আয়োজন করে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিলেন জর্জ হ্যারিসন ও রবিশঙ্কর। ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর ৫০ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে দীর্ঘদিন থেকে প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণের কাজ করছিলেন শামীম আল আমিন।

প্রামাণ্যচিত্রটিতে সাক্ষাতকার দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতিমান চিত্র পরিচালক লিয়ার লেভিন, কনসার্ট ফর বাংলাদেশে অংশ নেয়া ওস্তাদ আলী আকবর খানের বড় ছেলে আশীষ খান, খ্যাতিমান লেখক জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, লেখক ও শিক্ষাবিদ হায়দার আলী খান, কনসার্টের প্রত্যক্ষদর্শী লিন্ডা এন্তোনোসি, অভীক দাশ গুপ্ত এবং কাজী সাহিদ হাসান’।

একটি দেশের জন্য গান’ বা ‘সংস ফর এ কান্ট্রি’ প্রামাণ্যচিত্রটির পরিচালনা ছাড়াও গবেষণা ও স্ক্রিপ্ট শামীম আল আমিনের। অনেকক্ষেত্রে ক্যামেরার পেছনেও কাজ করতে হয়েছে তাকে। এই প্রামাণ্যচিত্রের অন্যতম আকর্ষণ বাংলাদেশের কিংবদন্তিতুল্য অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ আসাদুজ্জামান নূর। ৩৮ মিনিটি দৈর্ঘ্যের এই প্রামাণ্যচিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। প্রামাণ্যচিত্রের ক্রিয়টিভ ডিরেক্টর কবি ও ইয়োগা আর্টিস্ট আশরাফুন নাহার লিউজা। পোস্টার ও টাইটেল অ্যানিমেশন করেছেন শিল্পী মামুন হোসাইন। সাবটাইটেল লিখেছেন সিলেট হযরত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এম শফিকুল ইসলাম। ক্যামেরায় অন্যান্যের মধ্যে কাজ করেছেন নূর হোসেন জুয়েল এবং কায়েস খন্দকার। সম্পাদনার কাজটি করেছেন তানজির ইসলাম রানা।

প্রামাণ্যচিত্রটির নির্মাতা শামীম আল আমিন বলেন, মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুদের আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর ঐতিহাসিক একটি উদ্যোগের নাম ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবসময়ই যা উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সেই ইতিহাস তুলে ধরার জন্যই এমন প্রচেষ্টা।

উল্লেখ্য, রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলা, বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া আর অসীম সাহসিকতায় শত্রুর মোকাবিলা করা মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাধারণ একেকটি অধ্যায়। সেই সঙ্গে ছিল দেশের জন্য অকাতরে জীবনদান; অগণন নারীর সল্ফ্ভ্রম হারানো। সম্মুখযোদ্ধাদের প্রেরণা জুগিয়েছে জাগরণের গান। যুদ্ধক্ষেত্রে তখন বাজছিল ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে’-এর মতো শিহরণ জাগানো গানগুলো। ঠিক তেমনিভাবে একাত্তরের আগস্ট মাসের একটি দিনে হাজার মাইল দূরে আর সাত সাগর তেরো নদীর পাড়ে বাংলাদেশের জন্য সুরের ঝঙ্কার তুলেছিলেন মানবতাবাদী বিশ্বসেরা একদল শিল্পী, যা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা বিশ্বকে। তৈরি হয়েছিল ভিন্ন এক ইতিহাস।

একটি দেশের জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের গায়কদের একত্রে এমন গান করার ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল গত শতাব্দীতে। ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেই আয়োজনটির নামই দেওয়া হয়েছিল ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। সেই কনসার্টের ভেন্যু হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল নিউইয়র্কের ‘ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন’কে। সেখানে গান গাওয়ার উদ্দেশ্যে সমবেত হয়েছিলেন সারাবিশ্বের সংগীত জগতের সুপারস্টার অনেকে। যাদের তখন ‘সুপার গ্রুপ’ নামে অভিহিত করা হয়েছিল। সেই আয়োজনে দর্শক-শ্রোতার উপস্থিতিও ছিল ইতিহাস গড়ার মতোই।

যে দেশটির সরকার ছিল আগ্রাসী পাকিস্তানিদের সমর্থক; সেই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই আয়োজিত হয়েছিল গানের সেই মহাআয়োজন। সেই দেশের মানুষই টিকিট কেটে সমবেত হয়েছিলেন দর্শক সারিতে। জড়ো হয়েছিলেন ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ। সংগীত পরিবেশন করেন আমেরিকানসহ বিশ্বের খ্যাতিমান শিল্পীরা। সেই কনসার্টের মাধ্যমে মানবসভ্যতায় গৃহীত হয়েছে নতুন শব্দজোড়া ‘বেনিফিট কনসার্ট’। এটিই ছিল আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে বড় আকারের প্রথম বেনিফিট কনসার্ট। এরপরই বড় কোনো উপলক্ষকে সামনে রেখে কনসার্ট আয়োজনের ধারণাটির সূত্রপাত হয়। সেই পথ দেখিয়েছে ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’।

তখন বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা আর মানবতার বিপর্যয় দেখে, অনেকের মতো কেঁদে উঠেছিল এক মানবতাবাদী মানুষের হৃদয়। তিনি পণ্ডিত রবিশঙ্কর। ভারতীয় এই বাঙালি সেতারবাদকের তখন জগৎজোড়া খ্যাতি। তিনি তখন বাংলার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তার বন্ধু জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে কথা বলেন। শরণার্থী মানুষগুলোকে সহায়তা করতে, একটি কনসার্ট আয়োজনের পরিকল্পনা করেন। সেই প্রস্তাবে সাড়া দিতে খুব বেশি সময় নেননি জর্জ হ্যারিসন।

পরবর্তীকালে জর্জ হ্যারিসন একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল রবিশঙ্করের পরিকল্পনা। সে কিছু একটা করতে চেয়েছিল। আমার সঙ্গে কথা বলে সে তার উদ্বেগের কথা জানায়। জানতে চায়, আমার কোনো পরামর্শ আছে কি না। এরপর আমরা শো করার বিষয়টি নিয়ে অর্ধেক রাত পর্যন্ত কথা বলি। তারপরই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি অনুষ্ঠানটি করব। তখন অনেককে একত্র করার চেষ্টা করি। আমাকে কিছু জিনিস সংগঠিত করতে হয়েছিল; তার মধ্যে ছিল ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন। আসলে এটাই। পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সফলভাবে এর বাস্তবায়ন পর্যন্ত এই পুরো আয়োজনটি সম্পন্ন করতে মাত্র চার সপ্তাহ সময় লেগেছিল।’

জর্জ হ্যারিসন ছিলেন বিশ্বে সাড়া জাগানো ব্যান্ড দল দ্য বিটলসের লিড গিটারিস্ট এবং ভোকাল। যখন কনসার্টের আয়োজন চলছিল, তারও দুই বছর আগে ১৯৬৯ সালে দ্য বিটলস ভেঙে গেছে। এ যেন একটি ব্যান্ড দল ভেঙে যাওয়া নয়, বিশ্বব্যাপী কোটি সংগীতপ্রেমীর হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া।

সেই সময় জর্জ হ্যারিসন তার অন্য বন্ধুদের নিউইয়র্কের জগদ্বিখ্যাত ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের ‘ দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। তার সাবেক দল দ্য বিটলসের সদস্যদেরও তিনি অংশ নিতে অনুরোধ করেন। পল ম্যাকার্টনি যোগ দিতে চাননি। জন লেনন বলেছিলেন যোগ দেবেন। স্ত্রীর সঙ্গে মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়ে ওঠেনি তারও। শেষ পর্যন্ত বিটলস ব্যান্ডের কেবল রিঙ্গো স্টার যোগ দেন ঐতিহাসিক সেই কনসার্টে।

তবে এখানেই থেমে থাকেননি জর্জ হ্যারিসন। অন্যদেরও আহ্বান জানান। তাতে সাড়া দিয়ে এসেছিলেন বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রিস্টন, লিয়ন রাসেল। ব্যান্ডদল ব্যাড ফিঙ্গারসহ যোগ দিয়েছিলেন আরও অনেকে। দ্য বিটলস ভেঙে যাওয়ার পর এটিই ছিল হ্যারিসনের সরাসরি অংশগ্রহণ করা প্রথম কোনো অনুষ্ঠান। এরিক ক্ল্যাপটনও এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রায় পাঁচ মাস পর কোনো সরাসরি অনুষ্ঠানে অংশ নিলেন। ১৯৬৯ সালের পর বব ডিলান প্রথমবারের মতো শ্রোতা-দর্শকদের সামনে এলেন। রবিশঙ্করের সঙ্গে উপমহাদেশের কিংবদন্তি সরোদবাদক আলি আকবর খানও ছিলেন অগ্রভাগে। তবলায় ছিলেন আল্লা রাখা আর তানপুরায় কমলা চক্রবর্তী।

সেদিনের জগদ্বিখ্যাত তারকাদের অংশগ্রহণে কনসার্টটির প্রভাব ছিল ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে সেই কনসার্টের প্রতিক্রিয়া হয়েছে অনেক। যাতে করে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ জেনেছিলেন বাংলাদেশের নাম। গোটা বিশ্ব সেদিন আরও ভালো করে জেনেছিল, পাকিস্তানি হায়েনারা কী তাণ্ডবই না চালাচ্ছে বাংলার সবুজ জমিনে। মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে, মনে দাগ কেটেছে সেই আয়োজন।

দুটি বেনিফিট কনসার্ট ও অন্যান্য অনুষঙ্গ থেকে পাওয়া অর্থ প্রায় আড়াই লাখ ডলার ইউনিসেফের মাধ্যমে শরণার্থীদের সাহায্যার্থে ব্যবহূত হয়েছিল। প্রকাশিত হয় কনসার্টের লাইভ অ্যালবাম; যা রীতিমতো বিক্রির রেকর্ড গড়ে। একটি বক্স থ্রি রেকর্ড সেট এবং অ্যাপল ফিল্মসের তথ্যচিত্র ১৯৭২ সালে চলচ্চিত্র আকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৭৩ সালে যা বেস্ট অ্যালবাম হিসেবে জিতে নেয় গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড। ২০০৫ সালে ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ নিয়ে ডিভিডির একটি বিশেষ সংকলন ছাড়া হয়। এতে ছিল দুটি ডেস্ক। যার প্রথমটিতে ছিল কনসার্টের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্রটি। দ্বিতীয় ডিস্কে ছিল ২০০৫ সালে ধারণকৃত ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ রিভিজিটেড উইথ জর্জ হ্যারিসন অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ নামের একটি তথ্যচিত্র।

সেই ঐতিহাসিক মুহুর্তগুলোকে ফ্রেমে ফ্রেমে বন্দি করে প্রামাণ্যচিত্র ‘একটি দেশের জন্য গান’ নির্মাণ করেছেন শামীম আল আমিন। ।