বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ফুটবল সম্প্রচারের স্বত্ব কেনা ও সম্প্রচার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। রোববার সচিবালয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা সম্প্রচার নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তথ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আওয়াল উপস্থিত ছিলেন

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ২০২২ সালের বিশ্বকাপে খেলা দেখানোর নামে সরকার প্রায় ১৪০ কোটি টাকা লুটপাট করেছে। ওই সময় রাষ্ট্রের এই বিপুল পরিমাণ টাকা লেনদেন হয়েছে তমা কনস্ট্রাকশনের নামে। আর এবার আমরা সেই একই কাজ মাত্র ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার মধ্যে সম্পন্ন করেছি। সেটা আরও কমিয়ে আনার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেনদরবার করছি। আশা করছি, এতে সরকারের কোনো বাড়তি ব্যয়ই হবে না।

তিনি আরও বলেন, ২০২২ সালে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের স্বত্ব কিনতে সরকারের ৯৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল। এবার ফিফার কাছ থেকে সরাসরি স্বত্ব কিনে প্রায় পুরো অর্থই সাব-লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে সরকারের জন্য এবার আনুমানিক মাত্র ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সঙ্গে এবারের সম্প্রচার ব্যয়ের তুলনা করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২২ সালের বিশ্বকাপে আপনারা সবাই জানেন, ফিফার কাছ থেকে ৩ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারে স্বত্ব কেনা হয়েছিল। তবে ফিফার কাছ থেকে সরাসরি না কিনে শ্রীলঙ্কা ও সিঙ্গাপুরের একটি যৌথ কোম্পানি প্রথমে সেই স্বত্ব কেনে। পরে বাংলাদেশের ‘তমা কনস্ট্রাকশন’ নামে একটি বেসরকারি ঠিকাদারি কোম্পানি ওই বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে স্বত্বটি কিনে আনে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার তমা কনস্ট্রাকশনের কাছ থেকে ৯৮ কোটি টাকা দিয়ে বিটিভির (বাংলাদেশ টেলিভিশন) জন্য সেই স্বত্ব কিনেছিল। এরপর বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘টি স্পোর্টস’-এর কাছে স্যাটেলাইট মিডিয়া রাইট ২২ কোটি টাকায় এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘টফি’-র কাছে ডিজিটাল মিডিয়া রাইট ১৭ কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়। হিসাবে কিছুটা কমবেশি হতে পারে, তবে সব মিলিয়ে তমা কনস্ট্রাকশনের মাধ্যমে সেবার প্রায় ১৪০ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছিল।

জহির উদ্দিন স্বপন দাবি করেন, তমা কনস্ট্রাকশন সিঙ্গাপুরের ওই কোম্পানিকে মূলত ৩ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল। বাকি অর্থের একটি বড় অংশ মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে ও লুটপাটে গেছে।

তিনি বলেন, ২০২২ সালের বিশ্বকাপের খরচের সঙ্গে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের খরচ তুলনা করতে হবে। তুলনা করলেই দেশের আপামর জনগণ বুঝতে পারবে যে, শেখ হাসিনার আমলে বিশ্বকাপ দেখানোর নামে কীভাবে দুর্নীতি হয়েছে, রাষ্ট্রের টাকা লোপাট হয়েছে এবং কীভাবে মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যবহার করা হয়েছে।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, এই সরকারের আমলে আমাদের নেতা তারেক রহমানের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল—জনগণকে খেলা দেখাতে হবে, কিন্তু দেশের বর্তমান করুণ অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে সরকারের তহবিল থেকে কোনো বাড়তি টাকা খরচ করা যাবে না। তাঁরই নির্দেশনায় আমরা ফিফার সঙ্গে লাগাতার দর-কষাকষি করেছি।

তিনি জানান, এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-বিষয়ক উপদেষ্টা, ফিফা কর্তৃপক্ষ এবং স্পোর্টস রিপোর্টারসহ যাঁদের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়েছে, তাঁদের সবারই সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিটিভি সরাসরি ফিফার কাছ থেকে ৩ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলারে এই সম্প্রচার স্বত্ব কিনতে সক্ষম হয়।

তথ্যমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গতবার এই প্রক্রিয়ায় দুজন মধ্যস্বত্বভোগী ছিল; একজন সিঙ্গাপুরে, আরেকজন দেশের ভেতরের তমা কনস্ট্রাকশন। এরপর জনগণের ট্যাক্সের ৯৮ কোটি টাকা সেই মধ্যস্বত্বভোগীকে পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল, যদিও বেসরকারিভাবে ২২ কোটি ও ১৭ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছিল। সেই তুলনায় এবার আমাদের খরচ নামমাত্র, যা মাত্র চার-পাঁচ কোটি টাকার মতো।