আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রবিবার বিকালে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত গুণীজন সংবর্ধনায় বক্তব্যকালে এই আহ্বান জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমরা ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো সংঘাত, কোনো সংঘর্ষ চাই না। আমরা সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে আহ্বান জানাব যে রা নিজেদের রাজনীতি করবেন, মতামত প্রচার করবেন, কিন্তু সংঘাতের মধ্যে কখনো যাবেন না। অতীতে আমরা দেখেছি এই ঠাকুরগাঁওয়ে কী অকথ্য নির্যাতন হয়েছে আমাদের গণতন্ত্রকামী মানুষগুলোর উপরে।
তাদেরকে গ্রেফতার করেছে, মিথ্যা মামলা দিয়েছে, শত শত মামলা এবং হাজার হাজার মিথ্যা মামলা দিয়ে শ্রমিক, আমাদের কৃষকদেরকে অত্যাচার করেছে, নির্যাতন করেছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা সেই সময়টা পার হয়ে এসেছি।’
‘আমার অনুরোধ থাকবে আপনাদের প্রতি, সকল রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দের কাছে যে, কোনো হানাহানি নয়, কোনো সংঘর্ষ নয়, আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে রাজনীতি করি আমরা। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় জিনিস যেটা সেটা হচ্ছে টলারেন্স, সহিষ্ণুতা। সেই সহিষ্ণুতা নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমাদেরকে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে তৈরি করতে হবে। এটা যদি আমরা তৈরি করতে পারি, তাহলে আমরা গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারব।
তিনি বলেন, ‘আমরা যে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছি, লড়াই করেছি, সেই গণতন্ত্রকে আমরা রক্ষা করতে চাই। সেই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা তৈরি করতে চাই। আমরা বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থেই একটা সমঝোতার রাজনীতি, পলিটিক্স অব রিকনসিলিয়েশন দেখতে চাই। আমরা দেখতে চাই মানুষের অভাব কী করে দূর করা যায় তার চেষ্টা করা। আমরা দেখতে চাই কী করে শিক্ষার উন্নয়ন করা।
আমরা দেখতে পাই এই যে আমাদের ছেলেমেয়েরা এখানে আছে, তারা যেন লেখাপড়া শেষ করে চাকরি পায়, ব্যবসা পায়। আমরা দেখতে চাই না যে এখানে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানের মধ্যে কোনো বিভেদ সৃষ্টি হোক। আমরা দেখতে চাই যে, এখানে সবাই একসাথে বাংলাদেশি নাগরিক হয়ে তারা এখানে বেঁচে থাকুক তাদের অধিকার নিয়ে। এই বিষয়গুলো আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে।’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ, আমরা বড় পিছিয়ে পড়া মানুষ। আমরা বড় দরিদ্র এলাকার বেশিরভাগ মানুষ। এবং আমরা ঠিক সেইভাবে চাইতেও জানি না। আজকে অনেক আনন্দের কথা যে আজকে আপনাদের নির্বাচনের পূর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন নির্বাচনী প্রচারণায় এসেছিলেন, তিনি আপনাদের সামনে কতগুলো কথা দিয়েছিলেন, আমরা যে দাবিগুলো রেখেছিলাম। তার মধ্যে ছিল আমাদের একটা পাবলিক ইউনিভার্সিটি, তাই না? বিশ্ববিদ্যালয়। হইছে বিশ্ববিদ্যালয়? জমি হয়ে গেছে। ভাইস চ্যান্সেলর বসে আছেন সামনে। কাল ইনশাআল্লাহ আমরা সেটার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করব। সেখানে আপনাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া, উচ্চ শিক্ষা লাভ করতে পারবে।
তিনি বলেন, এখানে মেডিকেল কলেজের কথা বলেছিলাম আমরা, মনে আছে আপনাদের? সেই মেডিকেল কলেজও হয়েছে। জায়গাও ঠিক হয়ে গেছে। এখন শুধু জমিটা ঠিক হবে এবং এখানে আগামী বছর থেকে ইনশাআল্লাহ ছাত্র ভর্তি শুরু হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, আমাদের ভুল্লী এবং রুহিয়া দুইটা আলাদা উপজেলা করার দাবি ছিল আপনাদের, তাই না? দুইটাই হয়ে গেছে ইনশাআল্লাহ। দুইটা ভাগ হয়েছে, ইউএনও জয়েন করেছে এবং কাজ শুরু হয়ে গেছে। বিমানবন্দর আপনারা চাইছিলেন। আমি অনেক না কেউ রাজি হইছে আপনাদের কথায়। এইজন্যে যে বিমানবন্দর হলে আমাদের সাধারণ মানুষ যে খুব একটা উপকৃত হবে তা না কিন্তু। তবে হ্যাঁ, বিমানবন্দর হলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যারা করবেন তাদের জন্য সহজ হবে, তাই না? এবং অন্যভাবে হবে। কিন্তু বিমানবন্দরটাকে যদি চালু করতে হয়, ভবিষ্যতে এটাকে রাখতে হয়, টিকিয়ে রাখতে হয়, তাহলে কিন্তু আমাদেরকে এখানে কলকারখানা বাড়াতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, আপনারা দেখেছেন, যে আমরা এখানে চীনা রাষ্ট্রদূতকে নিয়ে এসেছিলাম। এই স্টেডিয়ামে তিনি প্রায় ছয় হাজার বাচ্চাকে স্কুল ব্যাগ দিয়েছিলেন, মনে আছে আপনাদের? কয়েকদিন আগে ১০ জন বাচ্চা স্কুলের, আর ১০ জন না? ১০ জন। আর ৫ জন শিক্ষক, তাদেরকে চীনে নিয়ে গিয়েছিল তারা। চীনে তারা দেখে, ঘুরিয়ে নিয়ে আসছে। আমরা আশা করছি যে এখানে এই কলকারখানা তৈরি করার জন্য চীন থেকেও তারা আসবে, বিশেষজ্ঞরা আসবে, তারা এখানে কীভাবে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা যায় সেই ব্যবস্থা করবে।
যুবসমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, চাকরি আর ঠিকাদারির পেছনে দৌড়ানো বাদ দিতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আমরা সবাই মিলে এমন সমাজ গড়ে তুলতে চাই যেখানে মানুষের মধ্যে মানুষের জন্য ভালোবাসা থাকবে। জীবনের বিনিময়ে হলেও যেন আমরা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্রের পক্ষে কাজ করতে পারি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবার নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়ে পৌঁছেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পূর্বনির্ধারিত সময় বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে ঠাকুরগাঁও মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়ামের হেলিপ্যাডে তার অবতরণের কথা থাকলেও তিনি পৌঁছান বেলা ১টার দিকে।
এরপর ঠাকুরগাঁও জেলা সার্কিট হাউজে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় তাকে। পরে তিনি সেনুয়া কবরস্থানে গিয়ে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করেন। পথে রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষকে হাত নেড়ে সম্ভাষণের জবাব দেন রাষ্ট্রপ্রধান।
বিকালে ঐতিহাসিক বড় মাঠে রাষ্ট্রপতির সম্মানে এক বর্ণাঢ্য নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। সেখানে জেলার সর্বস্তরের মানুষের পক্ষ থেকে তাকে এ সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সংবর্ধনা শুরুর আগেই অবশ্য হঠাৎ পুরো শহর অন্ধকার হয়ে মুষলধারে বৃষ্টি নেমে আসে। তবে বৃষ্টি বা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগই লাখো মানুষের এই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ও আনন্দকে থামাতে পারেনি।
রাষ্ট্রপ্রধানের আগমনকে কেন্দ্র করে পুরো জেলাজুড়েই বইছে উৎসবের আমেজ। তাকে বরণ করে নিতে শহরের প্রধান সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও প্রধান প্রবেশপথগুলো সাজানো হয়েছে বর্ণিল ব্যানার, ফেস্টুন, তোরণ ও আলোকসজ্জায়। নাগরিক সংবর্ধনাসহ একগুচ্ছ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার।
সফরের দ্বিতীয় দিন সোমবার তিনি ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।
এদিকে রাষ্ট্রপতির সফরকে কেন্দ্র করে পুরো জেলায় নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সড়ক ও অনুষ্ঠানস্থলগুলোতে বাড়ানো হয়েছে বিশেষ নজরদারি। রাষ্ট্রপতির চলাচলের পুরো পথজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
একসময় যিনি ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের সাধারণ মানুষের অতি আপনজন, আজ সেই ‘ঘরের ছেলে’কে রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে দেখে গর্বিত পুরো জেলার মানুষ। প্রিয় নেতা তথা দেশের নতুন রাষ্ট্রপতিকে একনজর দেখতে এবং সরাসরি বরণ করে নিতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের সর্বস্তরের মানুষ।












