ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে জাতীয় পার্টির (জাপা)। দলটি ১৯৬টি আসনে প্রার্থী দিলেও একটিতেও জয় পায়নি। ১৯৯১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত আটটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনও না কোনও আসনে প্রতিনিধিত্ব রাখা দলটি এবার প্রথমবারের মতো শূন্য হাতে সংসদের বাইরে রয়ে গেল। তিন দশকের রাজনৈতিক পথচলায় এমন পরিণতি দলটির জন্য এক নজিরবিহীন অধ্যায়।

নির্বাচনে জাতীয় পার্টির দুর্গ বলে খ্যাত রংপুর বিভাগে ইতিহাসের বড় ধস নামল দলটির। বিভাগের কোনও আসনেই জয় পায়নি জাতীয় পার্টি। শুধু তাই নয়, ভোটের লড়াইয়েই টিকে থাকতে পারেননি দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী।

বেসরকারি ফল অনুযায়ী, রংপুর-৩ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মো. মাহবুবুর রহমান বেলাল ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বিএনপির প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু ৭৪ হাজার ১৭১ ভোট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকেন। অন্যদিকে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের পান ৩৭ হাজার ৯৩৩ ভোট।

নির্বাচনের দিন জিএম কাদের নিজে ভোটকেন্দ্রে যাননি। তিনি সারাদিন নগরীর নিউসেনপাড়া এলাকার বাসায় ছিলেন। যদিও দলের পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছিল, ভোটের দিন সকালে বাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে তিনি ভোট দেবেন।

রংপুরের বাইরেও জাতীয় পার্টির পরাজয়ের ধাক্কা স্পষ্ট। গাইবান্ধা-১ আসনে জামায়াতের মো. মাজেদুর রহমান ১ লাখ ৪০ হাজার ৭২৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হলেও সেখানে শামীম হায়দার পাটোয়ারী পান ৩৩ হাজার ৯৭৬ ভোট।

১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সামরিক শাসনকে বেসামরিক রূপ দিতে জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার দুই বছরের মধ্যে দলটি দুটি সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে। তবে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দলটি আর আগের আধিপত্য ফিরে পায়নি।
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট সরকারে অংশ নেয় এবং ২০১৪ সালের পর সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন জোটে অংশ নেয়ার কারণে ‘দ্বৈত ভূমিকা’ ও ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ তকমাও পায়।

এরশাদের মৃত্যুর পর নেতৃত্ব সংকট ও বিভক্তি দলটিকে আরও দুর্বল করে। বর্তমানে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) নামে নিবন্ধিত দলটি দুই ভাগে বিভক্ত একটির নেতৃত্বে জিএম কাদের ও শামীম হায়দার পাটোয়ারী, অন্যটির নেতৃত্বে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের টানা ১৬ বছরের শাসনামলে অনুষ্ঠিত তৃতীয় এবং সর্বশেষ নির্বাচন। বিএনপি এই নির্বাচনটি বর্জন করে এবং একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবারো বিজয়ী হয়। ওই বছরেই ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট এক গণঅভ্যুত্থানে দলটি ক্ষমতাচ্যুত হয়। অন্তর্র্বতী সরকার নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় দেশের অন্যতম প্রধান দল আওয়ামী লীগ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি। সবমিলিয়ে বলা যায় বাংলাদেশের জন্য নতুন নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।