অবশেষে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। প্রায় ২৫ বছর আগে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ শুরু করেছিল। আগামী বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদনের জন্য ওঠানো হতে পারে। এই প্রকল্পে খরচ ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা।
নদী পুনরুজ্জীবন, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা এবং পানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করতে প্রকল্পটি দেশের অন্যতম বৃহৎ পানি অবকাঠামো উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের ২৪টি জেলার মানুষ উপকৃত হবে।
এই প্রকল্প প্রস্তাবের নথি অনুসারে, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার পদ্মা নদীতে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে। পদ্মা নদীর ওপর নির্ভরশীল দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ জমিতে পানির সমস্যা সমাধানে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি নদীকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে। যার মাধ্যমে সুন্দরবন অঞ্চল থেকে আসা লবণাক্ততার নিরসন হবে। এতে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে। বাড়বে কৃষি ও মাছের উৎপাদনও।
বুধবারের একনেক সভায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণসহ ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপনের কথা আছে। নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণের অংশ হিসেবে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে কেন এত বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, জানতে চাইলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি) বলেন, ‘এই প্রকল্পটির বিষয়ে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার রয়েছে। তাই এটি নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। একনেক সভায় বিস্তারিত আলোচনা হবে। তারপর এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে।’
মূলত ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে পানির যে সংকট দেখা দেয়, তা থেকে কিছুটা রেহাই পেতে প্রকল্পটি প্রস্তুত করা হয়েছে বলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। সে জন্য কয়েক দশকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে পদ্মা ব্যারাজ নামের প্রকল্পটি পাসের অপেক্ষায় আছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের আওতায় প্রকল্পটির চূড়ান্ত প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। এ বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, ‘ফারাক্কা বাঁধের কারণে পানির অভাবে আমাদের বিস্তীর্ণ এলাকা শুকিয়ে গেছে। তাপমাত্রাও বেড়ে গেছে। নিশ্চিতভাবেই এ বাঁধের মাধ্যমে সেটার প্রভাব কিছুটা কাটিয়ে ওঠা যাবে। এখানে পানি জমিয়ে আমরা সারা বছর সরবরাহ করতে পারব।’
প্রকল্পটি অবস্থা জানতে চাইলে মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, ‘আমরা আমাদের কাজ শেষ করে প্রকল্পটি একনেকের জন্য পাঠিয়েছি। এখন সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’
প্রকল্পে কী আছে প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে। যাতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস ও ২টি ফিশ পাস। এ বাঁধের মাধ্যমে ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা যাবে। আর সংরক্ষিত পানি বণ্টনের জন্য তিনটি অফটেক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
সংরক্ষিত পানি দিয়ে পাঁচটি নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করা হবে। এগুলো হলো হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক মিটার পানি সরবরাহ করা হবে।
প্রকল্পের নথি বলছে, বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের চাষযোগ্য প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষি জমিতে প্রয়োজনীয় সেচের পানি সরবরাহ করা যাবে। এতে প্রায় ২৪ লাখ টন ধানের ও ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের নথি অনুসারে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
কেন এই প্রকল্প প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সত্তর দশকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের কারণে বাংলাদেশের পদ্মার প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। এতে পদ্মার সঙ্গে সংযুক্ত ছয়টি নদী শুকিয়ে যায়। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল থমকে গিয়ে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এদিকে বৃহত্তর রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর ও বরিশাল জেলায় পদ্মা নদী একমাত্র সুপেয় পানির উৎস। তাই এসব এলাকার উন্নয়ন যথাযথ পানি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। এ জন্য বর্ষার পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রিত পানি সরবরাহের জন্য বাঁধটি নির্মাণ করা হবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে প্রথম পর্যায়ে ব্যয় হবে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। ২০২৬ সাল থেকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত এ কাজ চলবে।
বিশেষজ্ঞরা যা বললেন একসময় প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পরিবেশ ও পানিসম্পদবিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত। তিনি বলেন, ‘এটা কোনো নতুন প্রকল্প নয়। ১৯৬৪ সালে এটার আলোচনা শুরু হয়। ১৯৯৭ সালে আমরা এর স্থান নির্ধারণ করি। বাঁধটি নির্মাণে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ভারত সরকার। তবে পরে নানা রাজনৈতিক কারণে তা আটকে যায়।’ প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অবহিত নন বলে জানালেও এটার উপকারিতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই বলে জানান তিনি। কিন্তু অর্থায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন এই বিশেষজ্ঞ।
দেশের পানি ব্যবস্থাপনা ও বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করে থাকে বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট।
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, পানির সংকট, সুন্দরবন এলাকায় লবণাক্ত ও পলি জমে জলাবদ্ধতার সমস্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। তাই স্বাদু পানির সরবরাহ বাড়াতেই হবে। সে জন্য এ বাঁধ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’
বিগত বিএনপি সরকারের আমলে ২০০২ সালে এ ধরনের একটি প্রকল্প নেওয়ার আলোচনা ছিল। এমন উদ্যোগের প্রাথমিক প্রস্তাবনা ছিল পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে, এমন তথ্য পাওয়া যায়।
২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। এরপর ২০১৬ সাল পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটির নকশা প্রণয়নে কাজ করে।












