রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর দেশের পরবর্তী ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে। শুক্রবার (২৪ ২৪ জুলাই) জাতীয় সংসদের সচিবালয় থেকে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পদত্যাগপত্র গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
সংবিধানের নিয়মানুযায়ী আপাতত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন এবং আগামী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে।
রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ড. আবদুল মঈন খানের নাম সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে।
তবে বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি পদে কে যোগ্য ব্যক্তি? তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন অন্তবর্তীকালীন সরকারের আইন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।
তার মতে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ পদে যোগ্য ব্যক্তি। শেখ হাসিনার দুঃশাসনকালে তিনি মহাসচিব হিসেবে দলের হাল ধরেছেন, বহুভাবে নির্যাতিত হয়েছেন এবং অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। রাজনীতিবিদদের মধ্যে তিনি মডারেট, সদাচারী ও সুবক্তা হিসেবে অগ্রগণ্য।
আসিফ নজরুল আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ বোঝাপড়ার সম্পর্ক রয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার কাছে তিনি ছিলেন সন্তানসম একজন। বিএনপিতে উপযুক্ত আরও কেউ কেউ আছেন।
তালিকায় আরও যাদের নাম
মির্জা ফখরুল ছাড়াও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান এবং নজরুল ইসলাম খানের নাম আলোচনায় রয়েছে। দলের প্রতি দীর্ঘদিনের আনুগত্য, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতার কারণে তাদেরও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া দলীয় সূত্রের দাবি, অরাজনৈতিক ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব হিসেবে অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহর নামও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে। তবে তিনি নিজে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। আমি কোনো কর্তৃপক্ষও নই। নতুন রাষ্ট্রপতি যিনি হবেন, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই অবগত আছেন।”
স্পিকারই এখন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর শুক্রবার বিকেল ৫টা ১ মিনিটে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। পরে তিনি সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
স্পিকার জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি গুরুতর স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে পদত্যাগ করেছেন। তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন।
এ ছাড়া সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে বা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাধ্যতামূলক।
অন্যদিকে, ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কোনো একজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও নির্বাচিত হতে পারেন।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ, নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালেই পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ফলে নির্বাচনকালীন সাংবিধানিক নানা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও নতুন রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চললেও, বিএনপি বা সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নাম ঘোষণা করা হয়নি। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে দলীয় মনোনয়ন ঘোষণার আগ পর্যন্ত।
উল্লেখ্য, গুরুতর স্বাস্থ্যগত কারণে মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করায় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
শুক্রবার বিকালে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
এর আগে মো. সাহাবুদ্দিন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানিং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনমিক নিউরোপ্যাথি নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এ রোগের কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। রোগসমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন। এ অবস্থায়, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ হতে পদত্যাগ করছি।












