সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম পদ্ধতিতে চাষাবাদে কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে। কিন্তু বিষমুক্ত সবজির বাজারব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকেরা। সারা দেশে আইপিএম কার্যক্রম কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হলেও কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাবে তাদের নিয়ে গঠিত আইপিএম ক্লাবের একটি বড় অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক মূল্যায়ন সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) কৌশলের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উৎপাদন (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্পটি দেশের ৬৪টি জেলার ২৭৫টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হয়। ৫৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার এই প্রকল্প ২০১৩ সালের জুলাই থেকে শুরু হয়ে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়ন করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। প্রকল্পটির আওতায় কৃষক মাঠ স্কুল ও আইপিএম ক্লাব স্থাপন এবং কৃষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উৎপাদন জোরদার করার লক্ষ্য ছিল।

কিটনাশকমুক্ত ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে সবজি ও ফলে জৈবিক বালাই ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জনপ্রিয় করাও এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন শেষে এর কী প্রভাব পড়েছে, সে বিষয়ে আইএমইডির পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি জরিপ পরিচালনা করেছে। প্রকল্পটির প্রভাব মূল্যায়নের জন্য ১ হাজার ২৪ জন উপকারভোগী ও ৫১২ জন কন্ট্রোল গ্রুপ কৃষকের সঙ্গে সরাসরি প্রশ্নমালা জরিপ, ৩২টি দলীয় আলোচনা এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ৬ হাজার ৭০০ কৃষক মাঠ স্কুল স্থাপন, ৬ হাজার ৭০০ আইপিএম ক্লাব স্থাপনের পাশাপাশি ৩ হাজার আইপিএম ক্লাবে সহায়তা করা; ৩ হাজার ৪৭৫টি জৈব কৃষি ও জৈবিক দমন ব্যবস্থাপনা প্রদর্শনীর আয়োজন করার লক্ষ্য ছিল।

জরিপের ফল অনুযায়ী দেশে কৃষকদের মধ্যে আইপিএম পদ্ধতিতে ফসল উত্পাদনে আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। প্রকল্প এলাকায় গড়ে প্রায় ৩০-৩৫ জন চাষি সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা কৌশলের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পূর্বের তুলনায় বালাইনাশক ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ১৪ দশমিক ২৬ শতাংশ কমেছে এবং কীটনাশক ব্যবহারের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ কমেছে।

এ পদ্ধতি ব্যবহারে একদিকে যেমন ফসল উৎপাদন খরচ হ্রাস পেয়েছে, তেমনি ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকদের পূর্বের তুলনায় আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, আইপিএম পদ্ধতি ব্যবহারকারী উপকারভোগী কৃষকদের ধান চাষে হেক্টরপ্রতি ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ, সবজি চাষে হেক্টরপ্রতি ২৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং ফল চাষে ১৪ শতাংশ খরচ কমেছে। ফলন বেড়েছে গড়ে ৫ থেকে ৭ শতাংশ।

তবে আইপিএম পদ্ধতি জনপ্রিয় হলেও কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাব, জটিল রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি, সদস্যদের সঞ্চয়ে অনীহার করাণে প্রায় ২০ ভাগ আইপিএম ক্লাব ইতিমধ্যে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। তাছাড়া নিরাপদ সবজি উৎপাদন হলেও সেগুলো বিক্রির জন্য আলাদা কোনো সুযোগ প্রকল্পে ছিল না। ফলে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি করতে আলাদা কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না।

অনেক চাষি বলেছেন, বাজারে জৈব বালাইনাশকের স্বল্পতা রয়েছে। তাছাড়া এগুলো ব্যবহারে খরচও বেশি। বাজারে স্বল্পমূল্যে জৈব বালাইনাশকের সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে কৃষকেরা আরো বেশি সফলতা পেতেন।

উল্লেখ্য, নিরাপদ সবজি উৎপাদনের এই প্রকল্প শেষ হলেও সমজাতীয় প্রকল্প চলমান রয়েছে। যেমন পরিবেশবান্ধব কৌশলের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উৎপাদন প্রকল্প, নিরাপদ উদ্ভিদতাত্ত্বিক ফসল উৎপাদন ও সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প, বাংলাদেশ শাক-সবজি, ফল ও পান ফসলের পোকামাকড় ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনায় জৈব বালাইনাশকভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প চলমান রয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ বলেন, কৃষকদের মধ্যে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে মূল সমস্যা হলো তাদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক বাজারজাতকরণ। নিরাপদ সবজির বাজার ব্যবস্থাপনা তৈরি হলে কৃষক পর্যায়ে আরো উৎসাহ বাড়বে।

তিনি জানান, ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় ইতিমধ্যে এ ধরনের বাজার তৈরি হয়েছে। এখন প্রতিটি জেলায় এ ধরনের ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব হলে প্রকৃত কৃষকেরা উপকৃত হবেন বলে তিনি মনে করেন।