হিমবাহধসে নেপালে সৃষ্ট ঢলের ৯ দিন পর ত্রিশূলী ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে দুই ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) ওই দুই ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়। তাঁদের একজন সঞ্জয় শাহ, অন্যজন কবির মহারাজন।

ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৭০ মিটার গভীরে আটকে পড়া এই দুই ব্যক্তিকে নিরাপদে বের করে আনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজারাম বাসনেত।

উদ্ধারের পরপরই সঞ্জয় শাহকে বিমানযোগে কাঠমান্ডুর উত্তর-পশ্চিমে বাত্তার এলাকার একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অন্যদিকে কবির মহারাজনকে চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুর ছাউনি সামরিক হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

নেপাল বিদ্যুৎ বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সুরেশ রাউতের বরাতে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর উদ্ধার পেলেও কবির মহারাজন উদ্ধারকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী দল জানায়, নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় একটি হিমবাহ ধসে পড়ার ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এই বিদ্যুৎ প্রকল্পটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই সময় পাহাড়ী ঢলের সাথে আসা কাদা, পাথর ও পানির তীব্র স্রোতে নদীর উপত্যকা প্লাবিত হয়ে সুড়ঙ্গের মুখ বন্ধ হয়ে গেলে ভেতরে আটকা পড়েন শ্রমিকেরা।

সুড়ঙ্গ থেকে একজনকে উদ্ধার করে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। এ সময় প্রার্থনার ভঙ্গিতে দুই হাত তুলে ধরেন তিনি। রাসুয়া, নেপাল, ৪ সেপ্টেম্বর

উদ্ধার অভিযানে শুরু থেকেই সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির সংসদ সদস্য ও প্রকৌশলী শ্রী রাম নেওপানে জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গের ভেতরে আরও মানুষ আটকা পড়ে থাকার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে আটকে পড়া অন্যান্যদের সন্ধানে সুড়ঙ্গের আরও গভীরে উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

শুক্রবার সকালে সুড়ঙ্গের গভীর থেকে মানুষের অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর শোনার পর উদ্ধার অভিযান নতুন মোড় নেয়। আটকা পড়াদের থেকে সাড়া পাওয়ার পরপরই নেপাল সেনাবাহিনী ও আর্মড পুলিশ ফোর্সের একটি যৌথ দল অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাদের উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

অভিযানের শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে সংসদ সদস্য নেওপানে বলেন, সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে উদ্ধারকর্মীরা চিৎকার করে বলেন, ‘আতঙ্কিত হবেন না, আমরা আপনাদের উদ্ধার করতে এসেছি।’ প্রতিউত্তরে ভেতর থেকে ক্ষীণ কণ্ঠে জানানো হয়, ‘ঠিক আছে।’ এই কথোপকথনের মাধ্যমেই সুড়ঙ্গের ভেতরে একাধিক ব্যক্তির প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

নেপালে প্রলয়ঙ্করী এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ইতোমধ্যে ১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। সুড়ঙ্গটির ভেতরে এখনও অন্যান্য কর্মী ও পথচারী আটকে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছে কর্তৃপক্ষ। নতুন করে প্রাণের সন্ধান মেলায় অবশিষ্ট আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের আশা জোরালো হয়েছে এবং উদ্ধার অভিযান তীব্র গতিতে অব্যাহত রয়েছে।

গত ২৬ আগস্ট ত্রিশূলী নদী উপত্যকায় নেমে আসা প্রলয়ঙ্করী বন্যায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১২৫২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ওই অঞ্চলের প্রধান সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র বিধ্বস্ত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন প্রকল্প থেকে এ পর্যন্ত ২৭০ জনেরও বেশি মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে নেপালের ১২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এখনো প্রায় ৯০০ শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে আনুমানিক ৫০০ জন বিভিন্ন সুড়ঙ্গে আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে বর্তমান উদ্ধারস্থলটিতে আরও ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক জীবিত থাকতে পারেন বলে জোরালো আশা প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ। সুড়ঙ্গে আটকে থাকা বাকিদের অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বর্তমানে পূর্ণশক্তিতে উদ্ধারকাজ পরিচালিত হচ্ছে।