ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নিজ দল তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পর পদত্যাগ না করার ঘোষণা দিয়েছেন রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। তার দাবি, তিনি তথা তার দল হারেনি, তাই মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করবেন না। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, পরাজয়ের পরেও কোনো মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ না করলে ভারতের সংবিধান অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে?

বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়, নিয়ম অনুযায়ী আজ বুধবার পশ্চিমবঙ্গের বিদায়ী মন্ত্রিসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। আইন অনুযায়ী আজকের পরে মমতাও যেমন মুখ্যমন্ত্রী থাকতে পারবেন না, তেমনই তার বিদায়ী মন্ত্রিসভারও আজকের পরে আর কার্যকর থাকবে না। কিন্তু নির্বাচনে পরাজয়ের পরে এখনও মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেননি মমতা। বরং তিনি ঘোষণা করেছেন যে তিনি পদত্যাগ করবেন না।

বিজেপির বিরুদ্ধে অসৎ উপায়ে নির্বাচনে জেতার অভিযোগ তুলেছেন মমতা।পদত্যাগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি কেন পদত্যাগ করব? আমরা হারিনি, তাই পদত্যাগ করবও না। পরাজয়ের প্রমাণ থাকলে আমরা পদত্যাগ করতাম। কেউ আমাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করলেও আমি করব না। আমি বলতে চাই যে আমরা নির্বাচনে হারিনি।’

ভারতের সংবিধানের ১৬৪ অনুচ্ছেদে রাজ্য মন্ত্রী পরিষদ গঠন এবং এই বিষয়ে রাজ্যপালের ক্ষমতা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

প্রতিটি নির্বাচনের পর, রাজ্যপাল বিধানসভায় কোন দলের কতজন বিধায়ক আছেন, সেই সংখ্যার মূল্যায়ন করেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। এরপর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
যদি কোনো মন্ত্রী সেই সভার সদস্য না হন, তবে তাকে ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচনে জিতে বিধায়ক হতে হবে। এই নিয়ম মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য যেমন, একই আইন অন্যান্য মন্ত্রীদের ক্ষেত্রেও সমান।

মমতা যখন ২০১১ সালে প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, সেবার তিনি বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করেননি। তাই মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করলেও তাকে ছয় মাসের মধ্যে ভোটে জিতে বিধানসভার সদস্য হতে হয়েছিল।

আবার ২০২১ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রাম আসন থেকে তিনি বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন, তবুও তিনি সেবারও মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরবর্তীতে কলকাতার ভবানীপুর আসন থেকে উপনির্বাচনে জিতে বিধানসভার সদস্য হন তিনি।

যদি ছয় মাসের মধ্যে কেউ বিধানসভার সদস্য না হতে পারেন, তাহলে সেই মন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী পদ হারান। সংবিধানের ১৬৪(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে মুখ্যমন্ত্রী ‘রাজ্যপালের ইচ্ছা সাপেক্ষে’ পদে অধিষ্ঠিত থাকেন।
রাজ্যপালের ইচ্ছা বলতে কী বোঝায়?

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পলিটিক্যাল স্টাডিজের ড. সুধীর কে. সুতার বলেছেন, ‘রাজ্যপালের ‘‘ইচ্ছা’’ আসলে নির্ধারিত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা একজন নেতার ওপর অর্পিত আস্থার মাধ্যমে। প্রতিটি নির্বাচনের পর, রাজ্যপাল বিধানসভায় দলের সংখ্যা মূল্যায়ন করেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানান।যদি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ না করেন, তবে রাজ্যপাল তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে সেই মুখ্যমন্ত্রীসহ মন্ত্রী পরিষদকে বরখাস্ত করতে পারেন।’

এ ছাড়া, ভারতীয় সংবিধানের ১৭২ নম্বর অনুচ্ছেদে রাজ্য বিধানসভাগুলোর (বিধানসভা এবং বিধান পরিষদ) মেয়াদকাল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।এই অনুচ্ছেদ অনুসারে, বিধানসভার মেয়াদ তার প্রথম অধিবেশনের তারিখ থেকে পাঁচ বছর। পাঁচ বছর পূর্ণ হলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

অনুচ্ছেদ ১৭২-এ বলা হয়েছে, ‘প্রতিটি রাজ্যের বিধানসভা, যদি তার আগে ভেঙে না দেওয়া হয়, তবে তার প্রথম বৈঠকের জন্য নির্ধারিত তারিখ থেকে পাঁচ বছরের জন্য বলবৎ থাকবে এবং উক্ত পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হলে বিধানসভাটি ভেঙে যাবে।’আর এই নিয়ম অনুযায়ী, আজ ৬ মে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের মেয়াদের শেষ দিন।

আজ পর্যন্তই মেয়াদ মমতার
দিল্লির বিধি সেন্টার ফর লিগ্যাল পলিসির সাংবিধানিক আইন কেন্দ্রের প্রধান স্বপ্নিল ত্রিপাঠি টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেছেন, ‘এটি একটি প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক প্রথা যে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করেন এবং নতুন সরকার শপথ গ্রহণ না করা পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তত্ত্বাবধায়ক মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পদে থাকেন।’
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘যদি এই প্রথা অনুসরণ না করা হয়, তাহলে আইনি স্থিতিতে কোনো পরিবর্তন আসে না। রাজ্যপাল তার ইচ্ছা প্রত্যাহার করে নতুন বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা নেতাকে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন।

সুতরাং, পদত্যাগ করতে অস্বীকার করাটা আইনের চেয়ে রাজনীতিরই বেশি বিষয়।’
স্বপ্নিল ত্রিপাঠি বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী, যে মুখ্যমন্ত্রীর আর সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থন নেই, তিনি পদে থাকতে পারেন না।’

সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং লোকসভার প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল পিডিটি আচারিয়া ইন্ডিয়া টুডেকে বলেছেন, ‘বর্তমানে আইনে এমন কিছুই নেই যা মমতাকে পদে থাকার অনুমতি দেবে। তিনি পদত্যাগ না করলেও কিছু যায় আসে না। পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী শপথ না নেওয়া পর্যন্ত রাজ্যপাল তাকে পদে থাকতে বলতে পারেন। কিন্তু সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, কোনো সরকার পাঁচ বছরের বেশি টিকতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘মমতা আজ পদত্যাগ করলেও, নতুন মুখ্যমন্ত্রী শপথ না নেওয়া পর্যন্ত রাজ্যপাল তাকে পদে থাকতে বলবেন।কার্যত, তার পদত্যাগ করার প্রয়োজন নেই। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, তিনি কেবল বর্তমান বিধানসভার মেয়াদের জন্যই মুখ্যমন্ত্রী থাকতে পারবেন। সেই তারিখের পর, তাকে আইন অনুযায়ী নিজে থেকেই মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে অপসারণ করা হবে।”

অতীতে কি এমন ঘটনা ঘটেছে?
নির্বাচনী পরাজয়ের পরে ইস্তফা দিতে অস্বীকার ভারতের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তবে একাধিক রাজ্যে বহু মুখ্যমন্ত্রীই বিভিন্ন কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত হওয়ার পরে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিতে অস্বীকার করেছেন।
২০২৪ সালে আবগরি দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হয়ে জেলে যাওয়ার পরে ইস্তফা দিতে অস্বীকার করেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তার বক্তব্য ছিল, সংবিধান অনুযায়ী জেল থেকে সরকার চালানোয় কোনো বাধা নেই।

এরও আগে ২০১৪ সালে অবৈধ সম্পত্তি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রী জে জয়ললিতা।এরপরও তিনি ইস্তফা দিতে অস্বীকার করেন। তবে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় আইন অনুযায়ী তাকে পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। এরপরে দলে তার কাছের বলে পরিচিত ও. পন্নিরসেলভম মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৯৬ সালে ৯৪০ কোটি ভারতীয় টাকার গো-খাদ্য কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত হন বিহারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদব। এরপর বিহারের তার ওপর ইস্তফা দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। লালু প্রসাদ যাদব প্রথমে ইস্তফা দিতে অস্বীকার করলেও পরে পদত্যাগ করে তার স্ত্রী রাবড়ি দেবীকে মুখ্যমন্ত্রী পদে বসিয়ে সরকারের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন।