বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলেও নতুন করে আবারও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। মূলত প্রণালিতে তেহরানের অনুমোদন ছাড়া তৈরি হওয়া একটি রুট প্রত্যাখ্যান করে জাহাজগুলোকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। তাদের দাবি, ইরানের নির্ধারিত নৌপথের বাইরে চলাচল করলে সংশ্লিষ্ট জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, আইআরজিসির নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে চালু হওয়া একটি নতুন নৌপথ প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সঙ্গে ওই পথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, এ রুটে চলাচল করলে তারা ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) প্রেস টিভিতে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসির নৌবাহিনী জানায়, ‘কিছু কর্তৃপক্ষ’ তেহরানকে অবহিত বা তাদের সঙ্গে সমন্বয় না করেই এই নতুন রুট তৈরি করেছে। তবে তারা ওই কর্তৃপক্ষ কারা, তা ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি।
আইআরজিসি বলেছে, শুধুমাত্র ইরানের নির্ধারিত নৌপথই বৈধ হিসেবে গণ্য হবে এবং জাহাজগুলোকে চলাচলের ক্ষেত্রে আইআরজিসি নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। তাদের দাবি, নির্ধারিত করিডরের বাইরে কোনও জাহাজ চলাচল করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এর আগে হরমুজ প্রণালির অপর তীরের দেশ ওমানও এ বিষয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছিল। তার পরপরই আইআরজিসির এই সতর্কবার্তা এলো।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, দেশটির পরিচালনায় থাকা আরও পাঁচটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এর মাধ্যমে প্রণালিটিতে চলাচলসংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরও শিথিল হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমানে দেশটির আরও ১৩টি জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে অবস্থান করছে।
এর আগে সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পর হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন অবস্থান তুলে ধরেছে ইরান। দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতেই থাকবে এবং এটি আর কখনোই যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরবে না।
আলোচনা শেষে দেশে ফিরে গালিবাফ বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি আর কখনোই যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরবে না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এর প্রশাসনিক তত্ত্বাবধান ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের হাতেই থাকবে।’
প্রসঙ্গত, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস বিশ্ববাজারে পৌঁছে যায়। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ প্রতিদিন এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।
এ কারণে হরমুজ প্রণালিতে যেকোনও উত্তেজনা বা চলাচল বিঘ্নের প্রভাব দ্রুত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পড়ে। এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বা জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে, সরবরাহব্যবস্থায় সংকট দেখা দিতে পারে এবং বিশ্ববাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। যুদ্ধ চলাকালে ইরান এই প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে এবং এর নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে কঠোর অবস্থান নেয়। পরবর্তীতে যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হলেও হরমুজকে ঘিরে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি।
বিশেষ করে নতুন শিপিং রুট, জাহাজ চলাচলের বিধিনিষেধ এবং প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালি এখন শুধু জ্বালানি পরিবহনের পথই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হয়েছে।












