মহানাটকীয় এক লড়াই দেখল ফুটবল বিশ্ব। পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার ম্যাচটি যারা দেখেছেন, তারা হয়তো বহুদিন মনে রাখবেন ফুটবলের এই অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চকে। যে লড়াইয়ে শেষ হাসি হাসল রোনালদোর পর্তুগাল। প্রথমার্ধে আক্রমণে দাপট দেখিয়ে ফিনিশিংয়ের ব্যর্থতায় জালের দেখা পেল না পর্তুগাল। এই সময়ে কিছুই করতে না পারা ক্রোয়েশিয়া বিরতির পর দারুণ খেলল।

এগিয়েও গেল তারা। ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াল পর্তুগাল। রেকর্ড গড়া ম্যাচ রেকর্ড গোলে রাঙালেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। যোগ করা সময়ে গসালো রামোসের গোল এগিয়ে নিল তাদের। তবে নাটকীয়তার তখনও ঢের বাকি। যোগ করা ১০ মিনিট পেরিয়ে, ত্রয়োদশ মিনিটে পর্তুগালের জালে বল পাঠাল ক্রোয়েশিয়া! কিন্তু তাদের উদযাপন থেমে গেল ভিএআরে গোল বাতিল হওয়ায়।

শুক্রবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টায় ম্যাচটি শুরু হয়। ম্যাচে একাধিক আক্রমণ করেও প্রথমার্ধে গোলের দেখা পায়নি কোনো দল। তবে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই লিড নেয় ক্রোয়েশিয়া। এরপর পেনাল্টি থেকে গোল করে পর্তুগালকে সমতায় ফেরান রোনালদো। গোল করার কিছুক্ষণ পর ম্যাচের ৮১ মিনিটে রোনালদোকে বদলি হিসেবে তুলে নিলেন কোচ রবার্তো মার্তিনেজ। তার জায়গায় মাঠে নামেন রুবেন নেভেস। মাঠ ছাড়ার সময় কিছুটা হতাশই ছিলেন পর্তুগিজ মহাতারকা।

ম্যাচের প্রথমার্ধে ক্রোয়েশিয়ার চেয়ে পর্তুগালের দাপট ছিল বেশি। তবে ফিনিশিং দূর্বলতায় গোলের দেখা পায়নি তার। ম্যাচের চার মিনিটে রাফায়েল লিয়াওয়ের দুর্দান্ত দৌড়ে গড়ে ওঠা আক্রমণ থেকে পরপর দুটি শট নেন ব্রুনো ফার্নান্দেজ। তবে দুবারই দারুণ সেভ করে পর্তুগালকে গোলবঞ্চিত করেন ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক দমিনিক লিভাকোভিচ। প্রথমার্ধে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ভালো কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেননি তিনি। অন্যদিকে, ক্রোয়েশিয়ার হয়ে লুকা মদ্রিচও নিজের স্বভাবসুলভ খেলতে পারেনি। এতে গোলশূন্য সমতায় থেকে বিরতিতে যায় দুইদল।

ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে ইভান পেরিসিচের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল ক্রোয়েশিয়া। পরে পেনাল্টি থেকে রোনালদো সমতা ফেরালে ম্যাচ গড়ায় রুদ্ধশ্বাস শেষ সময়ে।

নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে যোগ করা সময়েও দুই দল মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালাতে থাকে। ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই কোচ রবার্তো মার্তিনেজের বদলি খেলোয়াড় নামানোর সিদ্ধান্ত কাজে দেয়।

৯৪তম মিনিটে বাম প্রান্তে বল পান রাফায়েল লিয়াও। ধৈর্য ধরে নিখুঁত একটি ক্রস ভাসিয়ে দেন বক্সের ভেতরে। সেখানে দুই ডিফেন্ডারের মাঝখান থেকে দারুণ উচ্চতায় লাফিয়ে উঠে শক্তিশালী হেডে বল জালে পাঠান বদলি ফরোয়ার্ড গনসালো রামোস।

লিভাকোভিচের কোনো সুযোগ ছিল না। রামোসের গোলে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় পর্তুগাল। বেঞ্চ থেকে নেমেই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেন তিনি।

গোল হজমের পর মরিয়া হয়ে ওঠে ক্রোয়েশিয়া। যোগ করা সময় পেরিয়ে গেলেও খেলার সমাপ্তি টানেননি রেফারি। অতিরিক্ত ১০ মিনিট পেরিয়ে খেলা গড়ায় ১৪ মিনিটে। শেষ দিকে তারা কর্নার আদায় করে এবং সেখান থেকেই শুরু হয় অবিশ্বাস্য নাটক।

অবিশ্বাস্য এক আক্রমণে গোল করে বসল ক্রোয়েশিয়া! সমতায় ফেরার আনন্দে বন্য উল্লাসে মাতল ক্রোয়াটরা। দীর্ঘ উদযাপনে যখন ম্যাচ শেষের আবহ তৈরি হচ্ছিল, ঠিক তখনই রেফারির বাঁশি। ভিএআর মনিটর দেখে রেফারি জানিয়ে দিলেন, গোলটি অফসাইড!
মুহূর্তেই ক্রোয়েশিয়ার ডাগআউটে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। বাঁধভাঙা আনন্দ রূপ নিল বিষাদে।

কিছুক্ষণ আগের হতাশ রোনালদোর মুখে তখন চওড়া হাসি, আর অন্যপ্রান্তে মাঠের ওপর বিষাদের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন লুকা মদরিচ। এই জয়েই শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিল পর্তুগাল। আর মদরিচরা ফিরে যাচ্ছেন বাড়ি।