গরমের এই সময়ে দেশে বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের তীব্র ঘাটতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সরকার এখন অফ-পিক সময়ের সাধারণ চাহিদাও পূরণ করতে পারছে না। গড়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে শিক্ষাক্ষেত্র সবখানেই এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গত সপ্তাহের মতো এই সপ্তাহেও প্রতিদিন পিক-আওয়ারে (বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়) ঘাটতি দেড় হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। এই ঘাটতির কারণে কিছু এলাকায় গড়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, তবে বিতরণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অন্যুায়ী, গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের স্থায়িত্ব অনেক বেশি।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন গ্রাহকরা জানিয়েছেন, তাদের প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং সহ্য করতে হচ্ছে
গতকাল দুপুর ১২টায় দিনের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ১৪ হাজার ৬৯ মেগাওয়াট; ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় এক হাজার ৪৬২ মেগাওয়াটে।
গতকাল প্রায় প্রতি ঘণ্টায় এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি ছিল, যা রাত ৯টায় সর্বোচ্চ এক হাজার ৮৪০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, গতকাল মধ্যরাতে ঘাটতির পরিমাণ দুই হাজার ৯৩২ মেগাওয়াট রাখার কথা ছিল, যা থেকে বোঝা যায় রাতের বেলাতেও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ মিলছে না।
এই সপ্তাহে গড় ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬৭ মেগাওয়াট, যা গত সপ্তাহের ৩৪৩ মেগাওয়াট এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের ৩৫৮ মেগাওয়াটের তুলনায় অনেক বেশি।
তথ্যানুযায়ী, খুলনা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর এবং কুমিল্লার গ্রামাঞ্চলগুলো সবচেয়ে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার হয়েছে; এসব অঞ্চলে বিদ্যুতের ঘাটতি ২০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে।
উদ্বিগ্ন কৃষকরা : যুদ্ধের কারণে বেশ কিছুদিন ধরেই কৃষকরা চাহিদামতো ডিজেল পাচ্ছেন না। এর সঙ্গে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। ফসলের উৎপাদন ঠিকমতো হওয়া নিয়ে চরম দুশ্চিন্তা এখন তাদের।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কৃষকরা জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পগুলো ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। কোনো কোনো এলাকায় দিনে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।
একই চিত্র দেখা গেছে খুলনায়। সেখানকার কৃষকরা জানান, যখন পাম্প চালানো প্রয়োজন, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ থাকছে না। এভাবে সেচকাজ ব্যাহত হতে থাকলে শেষ পর্যন্ত ধান উৎপাদন কমে যাওয়ার বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে উৎপাদন ব্যাহত : ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুতের এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে উৎপাদন সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
লোডশেডিংয়ের চিত্র : চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় সর্বত্রই লোডশেডিং বেড়েছে। কোথাও ৩০ শতাংশ, কোথাও ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি থাকায় বাধ্য হয়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে।
দেশে অবস্থিত ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট। যদিও বছরের পুরোটা সময় এ সক্ষমতার অর্ধেক অলস বসে থাকে। দেশে অবস্থিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮৮ শতাংশ তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। তবে বর্তমানে জজ্বালানি সংকটে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র ১০টি ও তেলভিত্তিক কেন্দ্র ৮টি। এ ছাড়া ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে উৎপাদন কমে গেছে ৩৫টির। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ৯টি, তেলভিত্তিক ২৪টি ও কয়লাচালিত কেন্দ্র রয়েছে ২টি।
এবারের গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে পিডিবি প্রক্ষেপণ করেছে। বর্তমানে গড়ে ১৫ থেকে সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। এই চাহিদার বিপরীতে গড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি) কোম্পানির সূত্র বলছে, গতকাল বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে। লোডশেডিং হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। আগের দিন সোমবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৯৩২ মেগাওয়াট। রবিবার সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং হয় ১ হাজার ৭৩০ মেগাওয়াট। শনিবার সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৭২৫ মেগাওয়াট, ঘাটতি ছিল ১ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট।











