জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যু রহস্য আজও উদঘাটন হয়নি। সেইসঙ্গে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গুঞ্জনও ডানা মেলেছে। এরমধ্যে একটি হচ্ছে সালমান শাহর মৃত্যুর পেছনে জনপ্রিয় অভিনেত্রী শাবনূরেরাজড়িত থাকার গুঞ্জন। যদিও তার সত্যতা মেলেনি কোনোদিন। তবুও তা আজও পিছু ছাড়েনি অভিনেত্রীর।
সম্প্রতি একাধিক সাক্ষাৎকারে সালমানের মমৃত্যুর পেছনে শাবনূরের জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছেন সালমান শাহ হত্যা মামলার রাজসাক্ষী রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ। এবার তার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন নায়িকা। সামাজিক মাধ্যমে আজ ৮ আগস্ট শাবনুর ‘রিজভীর গালগল্প ও অসত্য বয়ান’ শীর্ষক একটি দীর্ঘ পোস্ট দিয়েছেন।
শাবনূর তার পোস্টে দাবি করেন, সালমান শাহর মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে রাজসাক্ষী হওয়া রিজভী আহমেদ ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে এ ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সালমান শাহকে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে আরও কয়েকজনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।
শাবনূর জানান, ওই সময় রিজভী প্রায় নয় মাস কারাগারে ছিলেন। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে যুক্তরাজ্যে চলে যান। সেখানে অবস্থানকালে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায়ও তিনি সালমান শাহ হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছিলেন বলে দাবি করেন শাবনূর।
তবে ২০১৯ সালে পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর একটি সাক্ষাৎকারে রিজভী সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য দেন বলে উল্লেখ করেন শাবনূর। তার দাবি, তখন রিজভী বলেছিলেন, তিনি সালমান শাহর মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত নন এবং সালমান আত্মহত্যা করেছিলেন।
শাবনূরের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দেওয়া দুটি সাক্ষাৎকারেও রিজভী সালমানের মৃত্যু আত্মহত্যা বলে দাবি করেছেন। একই সঙ্গে তিনি সালমানের মা নীলা চৌধুরীকে ছেলের মৃত্যুর জন্য দায়ী করার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো শাবনূরের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তুলেছেন।
রিজভীর বক্তব্যের অসঙ্গতি তুলে ধরে শাবনূর প্রশ্ন তোলেন, একই ব্যক্তি একই ঘটনা নিয়ে সময়ে সময়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিলে তার সর্বশেষ বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তার দাবি, সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারগুলোতে রিজভী আরও বেশ কিছু অসংগতিপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন।
শাবনূর আরও বলেন, একটি সাক্ষাৎকারে রিজভী দাবি করেছেন, তিনি তাকে ভালোবাসতেন এবং বিয়েও করতে চেয়েছিলেন। আবার অন্য একটি সাক্ষাৎকারে রিজভী তাকে নিজের সাবেক প্রেমিকা দাবি করে ২০১৬ সালে বিয়ে এবং ২০১৮ সালে বিচ্ছেদের কথাও বলেছেন।
এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন উল্লেখ করে শাবনূর বলেন, রিজভী ১৯৯৯ সাল থেকে প্রায় ২৬-২৭ বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন এবং তার নিজের বক্তব্য অনুযায়ী এই সময়ে বাংলাদেশে আসেননি। অন্যদিকে, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে শাবনূরও যুক্তরাজ্যে যাননি। ফলে তাদের বিয়ের দাবির কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই বলে দাবি করেন তিনি। এমনকি রসিকতা করে শাবনূর বলেন, বাস্তবে বিয়ে না হয়ে হয়তো রিজভীর ‘স্বপ্নের বাসর’ হয়েছিল।
রিজভী আহমেদ প্রবল বিদ্বেষের সঙ্গে দাবি করেছে যে, আমি নাকি সালমান শাহকে ব্ল্যাকমেইল করতাম এবং তার আত্মহত্যার জন্য আমাকে দায়ী করেছে। অথচ রিজভীর নাম আমি প্রথম শুনেছি সালমান শাহর মৃত্যুর পর, যখন সে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার ঘটনায় রাজসাক্ষী হয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন হলো সে কীভাবে এবং কোন ভিত্তিতে দাবি করছে যে আমি সালমান শাহকে ব্ল্যাকমেইল করতাম? রিজভী দাবি করছে, আমি নাকি কূটনামী করতাম বা সালমান ও তার স্ত্রীর একের কথা অন্যের কানে লাগাতাম। এমন ভিত্তিহীন গুজব আরও কিছু অসৎ ব্যক্তি ছড়িয়েছে বলে শুনেছি। এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
এ ধরনের আচরণ কখনোই আমার স্বভাবের মধ্যে ছিল না। আমার পরিবারও আমাকে এমন শিক্ষা দেয়নি। আর এসব করার সময়ও আমার ছিল না। চলচ্চিত্র অঙ্গনের কেউই কোনোদিন বলতে পারবেন না যে আমি কারও সঙ্গে এমন কূটনামী করেছি। রিজভীর কথাবার্তায় সালমান শাহর পরিবারের প্রতিও প্রবল ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে। সে দাবি করেছে, সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী তার ফুফু। কিন্তু একই সঙ্গে তার সম্পর্কে এমন সব আপত্তিকর মন্তব্য করেছে যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো সালমান শাহ হত্যা মামলার অভিযুক্ত অন্যসব ১১ জনকেই সে নির্দোষ বলে দাবি করেছে!
রিজভী আহমেদের সঙ্গে আমার কখনো কোনো যোগাযোগ ছিল না, এখনও নেই। সে আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো করেছে সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং অত্যন্ত মানহানিকর। তাছাড়া ‘আরজে নীরব’-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সে আরও অনেক উদ্ভট ও ভারসাম্যহীন কথাবার্তা বলেছে। যেমন তার দাবি অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে সে পাসপোর্ট, ভিসা ও টিকিট ছাড়াই যুক্তরাজ্যে গেছে। এমনকি বৃটিশ এয়ারওয়েজের একটি পুরো বিমান নাকি একাই ভাড়া করে সেখানে গিয়েছিল।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সে বিমানে করে নগদ এক লাখ চল্লিশ হাজার বৃটিশ পাউন্ড সঙ্গে নিয়ে যায় আর তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। সে আরও দাবি করেছে, সে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই সেখানে একটি বাড়ি কিনে ফেলেছিল। এছাড়া বাংলাদেশে তাদের কত হাজার বিঘা জমি রয়েছে সেটি নাকি সে নিজেই জানে না। এমনকি সে দাবি করেছে, সালমান খান ও শাহরুখ খানের সাথে তার কথা হয়। তারা তার ফেসবুক ফ্রেন্ডস, তাদের সাথে মাঝেমধ্যে গ্রুপকলে আড্ডা মারে। তার এসব গালগল্পের কোনটি কতটা বাস্তবসম্মত বা বিশ্বাসযোগ্য সেই মূল্যায়ন আমি আমার ভক্ত ও দর্শকদের বিবেচনার ওপরই ছেড়ে দিলাম।
সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী (আন্টি) তার ছেলের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে পুনরায় মামলা করার পর ওই মামলায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। মামলার মোড় ঘুরে যাওয়ার কারণে অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাই আমার ধারণা, তাদের প্ররোচনায় বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এমনকি আর্থিক প্রলোভনে পড়েও রিজভী আহমেদ আমার ও নীলা আন্টির বিরুদ্ধে এসব ভিত্তিহীন বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারে। নিজেদের রক্ষা করা এবং প্রকৃত সত্যকে আড়াল করাই হয়তো তাদের উদ্দেশ্য।
আমি বরাবরের মতোই স্পষ্ট করে বলতে চাই, সালমান শাহর মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমার বিন্দুমাত্র কোনো সংযোগ ছিল না। তিনি কীভাবে মারা গেছেন সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। সালমান শাহ শুধু একজন জনপ্রিয় নায়কই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমার অত্যন্ত প্রিয় সহশিল্পী এবং বড় ভাইয়ের মতো একজন মানুষ। তার অকাল মৃত্যু আজও আমাকে ব্যথিত করে। আমি আন্তরিকভাবে চাই, একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটিত হোক এবং এই ঘটনায় কেউ জড়িত থাকলে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।












